
মো. আব্দুল করিম গাজী,শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধিঃ একসময় সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ জলপথে দাপিয়ে বেড়াত দুটি রাজকীয় জলযান এমএল ‘বন কন্যা’ ও এমএল ‘বন রানী’। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে সুন্দরবনের বন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত এই দুই জলযান শুধু পরিবহনের মাধ্যম ছিল না; এগুলো ছিল সুন্দরবনের প্রশাসনিক ইতিহাস, ঔপনিবেশিক আমলের স্মৃতি এবং বাংলাদেশের প্রাচীন নৌ-ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল।
ব্রিটিশ আমলে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সুন্দরবন পরিদর্শন ও জলপথে যাতায়াতের জন্য কলকাতার খিদিরপুর ডকইয়ার্ডে নির্মিত হয়েছিল বিলাসবহুল এই দুই জলযান। সময়ের সাক্ষী হয়ে দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সুন্দরবনের নদী-খাল পাড়ি দিয়েছে ‘বন কন্যা’ ও ‘বন রানী’। দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরও বহন করেছে ঐতিহ্যবাহী এই জলযান দুটি। কিন্তু কালের বিবর্তনে জৌলুশ হারিয়েছে তাদের। নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একপর্যায়ে অচল হয়ে পড়ে ঐতিহাসিক জলযান দুটি। খুলনার চানমারী ও ফরেস্ট ঘাট এলাকায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থেকে ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে শত বছরের স্মৃতিবাহী এই জলযান।
চলতি বছরের (৩০ মার্চ) নিলাম টেন্ডারের মাধ্যমে ‘এমএল বনরানী’ বিক্রি হয় ২৬ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ টাকায়। আর ‘এমএল বনকন্যা’ (১১ মে) বিক্রি হয় ২০ লাখ ২৭ হাজার টাকায়। অর্থাৎ দুটি লঞ্চ মিলিয়ে বন বিভাগের আয় হয়েছে ৪৭ লাখ ২২ হাজার ১০০ টাকা। এর মধ্য দিয়ে সুন্দরবনের নৌ-ঐতিহ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে বন বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কেরও অবসান ঘটল। শতবর্ষের পুরোনো নির্মাণশৈলী: বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯০২ সালে প্রায় ৩৮ হাজার টাকা ব্যয়ে এমএল বন কন্যা নির্মাণ করা হয়। ছয় বছর পর ১৯০৮ সালে প্রায় ৫২ হাজার ৯৪৭ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় এমএল বন রানী। ২০২৬ সালে এসে বন কন্যার বয়স দাঁড়িয়েছে ১২৪ বছর এবং বন রানীর ১১৮ বছর। শুধু বয়সের দিক থেকেই নয়, নির্মাণশৈলীর দিক থেকেও জলযান দুটি ছিল ব্যতিক্রমী। দীর্ঘদিন এগুলোর সঙ্গে কাজ করা ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, জলযান দুটির অভ্যন্তরে ব্যবহৃত হয়েছিল বার্মিজ সেগুন কাঠ, যার ওপর ছিল অভিজাত কারুকাজ। কাঠের সূক্ষ্ম নকশা, পুরোনো দিনের নির্মাণকৌশল এবং রাজকীয় অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা জলযান দুটিকে সাধারণ নৌযানের চেয়ে আলাদা মর্যাদা দিয়েছিল।
বন রানীর সর্বশেষ চালক জাফর মাস্টার ও লস্কর মো. হারুন মোল্লার ভাষ্য, শত বছরেরও বেশি সময় ধরে সেবা দেওয়া এই জলযান দুটির ভেতরে বার্মিজ সেগুন কাঠের কারুকাজ ছিল, যা বর্তমান সময়ের আধুনিক নৌযানেও বিরল। সুন্দরবনের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী ‘বন কন্যা’ ও ‘বন রানী’র সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সুন্দরবনের বন ব্যবস্থাপনার দীর্ঘ ইতিহাস। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের বন প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের সাক্ষী হয়ে ছিল জলযান দুটি। সুন্দরবনের দুর্গম নদী ও খালে বন কর্মকর্তাদের পরিদর্শন, বন ব্যবস্থাপনা, জরিপ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে এসব জলযানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ফলে এগুলোকে শুধু পুরোনো নৌযান হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেকটাই আড়ালে পড়ে যায়। এগুলো ছিল সুন্দরবনের জলপথকেন্দ্রিক প্রশাসনিক ইতিহাসের জীবন্ত স্মারক। দীর্ঘদিনের ব্যবহার, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং সংস্কারের অভাবে শেষ পর্যন্ত জলযান দুটি সচলতা হারায়। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সাল পর্যন্ত এগুলো সচল ছিল। এরপর ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত অবস্থায় চলে যায়।
জাদুঘর হতে পারত, হলো নিলামের সম্পদ
ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় ‘বন কন্যা’ ও ‘বন রানী’কে সংরক্ষণ করে সুন্দরবনভিত্তিক কোনো জাদুঘর, পর্যটনকেন্দ্র কিংবা ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার অংশ হিসেবে প্রদর্শনের সুযোগ ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বনজ সম্পদ ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের পাশাপাশি এর মানবিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসও সংরক্ষণের দাবি রাখে। সেই বিবেচনায় শত বছরের পুরোনো এই জলযান দুটি পর্যটকদের কাছে সুন্দরবনের অতীত ইতিহাস তুলে ধরার অনন্য আকর্ষণ হতে পারত। একটি পুরোনো জলযান কখনো কখনো শুধু কাঠ, লোহা আর যন্ত্রাংশের সমষ্টি নয়—তার সঙ্গে মিশে থাকে একটি জনপদের স্মৃতি, মানুষের কর্মজীবন, রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড এবং সময়ের গল্প। ‘বন কন্যা’ ও ‘বন রানী’র ক্ষেত্রেও বিষয়টি ছিল তেমনই।
রেপ্লিকা তৈরির পরিকল্পনা: তবে ঐতিহাসিক স্মৃতি পুরোপুরি হারিয়ে না যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। বন বিভাগ খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) ইমরান আহমেদ জানিয়েছেন, ‘বন রানী’ ও ‘বন কন্যা’র ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। নতুন প্রজন্মের সামনে এসব স্মৃতি তুলে ধরতে ভবিষ্যতে জলযান দুটির রেপ্লিকা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছেন তিনি।
প্রশ্ন থেকে যায় তবে রেপ্লিকা দিয়ে কি সত্যিই শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যের বিকল্প তৈরি করা সম্ভব?
ইতিহাসের মূল নিদর্শন আর তার প্রতিরূপ কখনো এক নয়। ‘বন কন্যা’ ও ‘বন রানী’ হয়তো এখন আর সুন্দরবনের নদীতে চলবে না। কিন্তু তাদের কাঠের গায়ে, কেবিনের দেয়ালে, পুরোনো যন্ত্রাংশে এবং দীর্ঘ ব্যবহারের চিহ্নে যে ইতিহাস জমে ছিল তা ছিল একেবারেই বাস্তব ও অমূল্য। নিলামের হাত ধরে তাই হয়তো দুটি পুরোনো জলযানের মালিকানা বদলেছে; কিন্তু হারিয়ে গেছে সুন্দরবনের নৌ-ঐতিহ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক সংরক্ষণের একটি বড় সুযোগ।
‘বন কন্যা’ ও ‘বন রানী’ হয়তো আর ফিরবে না সুন্দরবনের জলপথে। তবে ইতিহাসের পাতায় তাদের যাত্রা থামবে না,যদি আমরা সেই ইতিহাস সংরক্ষণ করি।
প্রতিবেদকের নাম 


















