
বর্তমানে কোম্পানীগঞ্জের দক্ষিণাঞ্চলে অবৈধভাবে মাটি ও বালু পরিবহনের যে বিস্তৃত কার্যক্রম চলছে, তা শুধু একটি অর্থনৈতিক অনিয়ম নয়—এটি জননিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য মাটিবাহী ট্রাক ও ট্রাক্টর সড়কের ধারণক্ষমতার বহু গুণ বেশি ওভারলোড নিয়ে চলাচল করছে। ফলে সড়ক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের চলাচল দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই অনিয়ন্ত্রিত যান চলাচলের কারণে শুধু সড়কের ক্ষয়ক্ষতিই বাড়ছে না, বরং প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহী ও স্থানীয় ব্যবসায়ী—কেউই নিরাপদ নয়। ধুলাবালি, কাদা ও অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক সড়ক এখন কার্যত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
এই সমস্যার ভয়াবহতা আমি নিজেই প্রত্যক্ষ করেছি। ২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল, ১৬ নম্বর সুইজ সংলগ্ন মুক্তিযোদ্ধা বাজার এলাকায় একটি গুরুতর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হই। আমার গাড়ির গতি ৪০ কিলোমিটারের কম থাকা সত্ত্বেও, অতিরিক্ত মাটি বহনকারী ট্রাকের কারণে সড়কে জমে থাকা কাদা ও পিচ্ছিল অবস্থার জন্য নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যাই। এতে আমার ডান হাতের কব্জি ভেঙে যায় এবং অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হাতে ধাতব প্লেট বসাতে হয়। আজও সেই শারীরিক যন্ত্রণা বহন করছি—শিক্ষক হিসেবে এক পৃষ্ঠার বেশি লিখতে পারি না, এমনকি ডান হাতে স্বাভাবিক কাজ করতেও কষ্ট হয়।
শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতিই নয়, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে। মুছাপুর-রামপুর সীমান্ত সড়কে কালু মোল্লার মসজিদের সামনে মাটিবাহী ট্রাক ও অন্য একটি গাড়ির সংঘর্ষের ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া গেছে, যা এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল ২০২৬) সকাল আনুমানিক ৯টা ২০ মিনিটে, মুছাপুর ইউনিয়নের বাগদারা বাজারে ইদ্রিসিয়া মাদ্রাসার সামনে। চৌধুরী বাজারের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর (৫০) দোকান খুলে মোটরসাইকেলে করে গুচ্ছগ্রামের দিকে যাওয়ার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মাটিবাহী ট্রাক্টর তাকে চাপা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এভাবে একটি পরিবারের স্বপ্ন মুহূর্তেই নিভে যায়।
অবৈধ মাটিকাটা ও পরিবহন নিয়ে মাননীয় সংসদ সদস্য জনাব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম জাতীয় সংসদে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় তাঁর নির্বাচনী এলাকায় অতিরিক্ত তিনটি পুলিশ ভ্যান বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন।
এভাবে যদি অবৈধ মাটিবাহী যান চলাচল অব্যাহত থাকে, তাহলে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে—এ প্রশ্ন এখন সবার। তাই সময় এসেছে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের। প্রশাসনের উচিত দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে অবৈধ ট্রাক চলাচল বন্ধ করা, ওভারলোড নিয়ন্ত্রণ করা এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।
জননিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়—এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার রক্ষায় এখনই উদ্যোগ নিতে হবে, নইলে এর মাশুল দিতে হবে আমাদের সবাইকে।
লেখক: মুহাম্মদ আবদুল্যাহ নয়ন
শিক্ষক, থানারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
প্রতিবেদকের নাম 

























