Dhaka ০৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ৭ মাসের পরোয়ানাভুক্ত মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপের মূল হোতা ‘মালা ভাবি’ গ্রেপ্তার ভাঙ্গুড়ায় মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশক ব্যবহারে কৃষক অসুস্থ টাঙ্গাইলের কালিহাতিতে ডিসির বিভিন্ন দপ্তর, বিদ্যালয় ও উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন ধুনট উপজেলা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক মালিক সমিতির প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত ফরিদগঞ্জে নারিকেল গাছের ডাল কাটতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে বৃদ্ধার মৃত্যু পদ্মায় মা ইলিশ শিকারের দায়ে ৩ জেলের কারাদণ্ড, এক লাখ মিটার কারেন্ট জাল ধ্বংস ধামইরহাটে প্রশাসনকে ব্যবহার করে দলীয়করণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কাউনিয়ায় তেজপাতা চাষে বদলাচ্ছে কৃষকের অর্থনৈতিক চিত্র সিলেটে ইয়াবাসহ মাদক কারবারী আটক সিলেটে পুকুরের মাছ ধরা নিয়ে যুবক খুন, আটক ১

দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যেই নীলফামারী থেকে সিলেটে বদলি যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন

রাব্বি রহমান নীলফামারী: নীলফামারী সদর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা ও গোড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মোঃ আলমগীর হোসেনকে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলায় বদলি করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একের পর এক অভিযোগ ওঠার মধ্যেই এ বদলির আদেশ জারি হওয়ায় এলাকায় তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের যুব-১ শাখা থেকে মঙ্গলবার (১২ মে ২০২৬) জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রজ্ঞাপনের স্মারক নম্বর ৩৪.০০.০০০০.০০০.৫২.০০০.১৮.২২১। এতে বলা হয়, মোঃ আলমগীর হোসেনকে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার কার্যালয়, সদর, নীলফামারী থেকে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার কার্যালয়, কানাইঘাটক, সিলেটে বদলি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, তাঁকে আগামী ১৮ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। অন্যথায় তাঁকে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (Stand Release) হিসেবে গণ্য করা হবে। ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১২ মে ২০২৬ তারিখে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপনটিতে স্বাক্ষর করেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ। এর আগে গোড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মোঃ আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য, ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, ভিজিএফ ও ভিডব্লিউবি কার্ডে অনিয়ম, প্রশিক্ষণ খাতে দুর্নীতি এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, টি.আর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতি লাখ টাকায় প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হতো।

 

 

প্রকল্প অনুমোদন, বিল ছাড় ও কাজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও জনপ্রতিনিধিদের ওপর অঘোষিত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ করেন একাধিক ইউপি সদস্য। সংরক্ষিত নারী সদস্য বিলকিস বেগম অভিযোগ করেন, প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার টাকার একটি প্রকল্প দেওয়ার সময় তাঁর কাছ থেকে অগ্রিম ৪০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। কাজ সম্পন্ন হলেও এখনো বিল পরিশোধ করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। একই ধরনের অভিযোগ করেন সংরক্ষিত নারী সদস্য চম্পা রানী। তিনি জানান, ২ লাখ ৬৩ হাজার টাকার প্রকল্পের বিপরীতে তাঁর কাছ থেকেও ৪০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। ইউপি সদস্য মশিউর রহমান অভিযোগ করে বলেন, টি.আর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের বরাদ্দের বিপরীতে প্রতি লাখে ২০ হাজার টাকা দিতে বাধ্য করা হতো। আমিসহ একাধিক সদস্য টাকা দিয়েছি। অভিযোগে আরও বলা হয়, পরিষদের ওয়ান পার্সেন্ট” খাতের প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়া মাটি কাটার কাজের নামে ১২ জন ইউপি সদস্যের কাছ থেকে প্রায় ২ লাখ টাকা নেওয়া হয়। একজন গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে ৬০ জনের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা করে আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বরাদ্দকৃত ভিজিএফ চাল বিতরণের পর অবশিষ্ট ১৫ বস্তা চাল বিক্রির অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এছাড়া ভিজিএফের প্রায় ৪০০টি কার্ড প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। অতিদরিদ্র কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে নাম অন্তর্ভুক্তির নামে জনপ্রতি ২৫ হাজার টাকা করে প্রায় ৩ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। ভিডব্লিউবি কার্ড প্রস্তুতের ক্ষেত্রে প্রতিটি কার্ডের জন্য ৫ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। মাতৃত্বকালীন ভাতার কার্ড করে দেওয়ার নামে ৩ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের ব্যাংক হিসাব থেকে ৪০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়া ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে দুই দফায় প্রায় ৬ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগও সামনে এসেছে। টিউবওয়েল, কাবিখা ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিচালিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

আরও পড়ুনঃ  রানীগঞ্জ রবিন মার্কেট বাজারে পাওয়া যাচ্ছে ০১ টাকায় লাউ। দিশেহারা কৃষক

 

 

নীলফামারী সদর উপজেলার গোড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদে ২০ নভেম্বর ২০২৫ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ৭ দিনব্যাপী অপ্রাতিষ্ঠানিক গবাদিপশু প্রশিক্ষণে ৬০০ টাকার পরিবর্তে ৫৫০ টাকা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে চাঁদের হাট হাই স্কুলে অনুষ্ঠিত ৭ দিনব্যাপী হাঁস-মুরগি প্রশিক্ষণে ৬০০ টাকার পরিবর্তে ৫৩০ টাকা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। চাঁদের হাট এলাকায় গবাদিপশু বিষয়ক প্রশিক্ষণে ৩০ জন প্রশিক্ষণার্থী দেখানো হলেও বাস্তবে অংশ নেন মাত্র ২২ জন। এতে প্রশিক্ষণ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া নাগরিকত্ব সনদ, প্রত্যয়নপত্র, ওয়ারিশান সনদ ও জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। যেখানে নাগরিকত্ব ও প্রত্যয়নপত্র বিনামূল্যে দেওয়ার কথা, সেখানে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জন্ম নিবন্ধনের জন্যও ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসকের নির্দেশে এক বহিরাগত যুবককে ইউনিয়ন পরিষদের দাপ্তরিক কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়। তাঁর মাধ্যমে জন্ম নিবন্ধন, প্রত্যয়নপত্র ও ওয়ারিশান সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হতো বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অভিযুক্ত ওই যুবকের নাম মোহাম্মদ শাওন ইসলাম। তিনি গোড়গ্রাম ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। গত ঈদুল ফিতর ২০২৫ উপলক্ষে ভিজিএফ চালের ভুয়া কার্ড তৈরির অভিযোগে তহিদুল ইসলামকে পুলিশ গ্রেফতার করে। উক্ত মামলাটি নিষ্পত্তি করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে নিজ হাতে লেখা কাগজে ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ১০০ টাকা দাবি করে। জানা যায় এ মামলা অর্থের বিনিময়ে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রশাসক আলমগীর হোসেন।

আরও পড়ুনঃ  কুমিল্লায় সিআইডি কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণার অভিযোগে আটক ১

 

 

এদিকে, গত ১২ মার্চ গোড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদে ইউপি সদস্য ও এলাকাবাসী প্রায় এক ঘণ্টা প্রশাসক আলমগীর হোসেনকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে অভিযোগের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নীলফামারী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত ২৫ মার্চ ২০২৬ তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয় নীলফামারী সদর উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তাকে। এছাড়া সদস্য হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা ও প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে। তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকলেও ১০ মে ২০২৬ প্রশাসক আলমগীর হোসেনের পদত্যাগ এবং পরে বদলির আদেশ নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এদিকে মঙ্গলবার (১২ মে ২০২৬) দুপুর ১২টার দিকে নীলফামারী সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর ইউপি সদস্য ও সংরক্ষিত মহিলা সদস্যরা লিখিত অভিযোগ জমা দেন। দুর্নীতির টাকায় তিনি কালীতলা ক্যানেল থেকে প্রায় ৫০০ মিটার উত্তরে জমি ক্রয় করেছেন, ৫ তলা ভবনের ভিত্তি প্রস্তর করেছেন এবং ব্যবহার করছেন ৪ চাকার গাড়ি। স্থানীয়দের দাবি, তাঁর সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আরও পড়ুনঃ  ধুনটে আদালতের তোয়াক্কা না করে দোকানের সামনে বেড়া, বন্ধ বেচাকেনা
Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ৭ মাসের পরোয়ানাভুক্ত মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপের মূল হোতা ‘মালা ভাবি’ গ্রেপ্তার

দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যেই নীলফামারী থেকে সিলেটে বদলি যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন

আপডেটের সময়: ০৩:১৬:৫১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

রাব্বি রহমান নীলফামারী: নীলফামারী সদর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা ও গোড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মোঃ আলমগীর হোসেনকে সিলেটের কানাইঘাট উপজেলায় বদলি করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের একের পর এক অভিযোগ ওঠার মধ্যেই এ বদলির আদেশ জারি হওয়ায় এলাকায় তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের যুব-১ শাখা থেকে মঙ্গলবার (১২ মে ২০২৬) জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রজ্ঞাপনের স্মারক নম্বর ৩৪.০০.০০০০.০০০.৫২.০০০.১৮.২২১। এতে বলা হয়, মোঃ আলমগীর হোসেনকে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার কার্যালয়, সদর, নীলফামারী থেকে উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার কার্যালয়, কানাইঘাটক, সিলেটে বদলি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, তাঁকে আগামী ১৮ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। অন্যথায় তাঁকে তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (Stand Release) হিসেবে গণ্য করা হবে। ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১২ মে ২০২৬ তারিখে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপনটিতে স্বাক্ষর করেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ। এর আগে গোড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মোঃ আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য, ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, ভিজিএফ ও ভিডব্লিউবি কার্ডে অনিয়ম, প্রশিক্ষণ খাতে দুর্নীতি এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, টি.আর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতি লাখ টাকায় প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হতো।

 

 

প্রকল্প অনুমোদন, বিল ছাড় ও কাজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও জনপ্রতিনিধিদের ওপর অঘোষিত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ করেন একাধিক ইউপি সদস্য। সংরক্ষিত নারী সদস্য বিলকিস বেগম অভিযোগ করেন, প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার টাকার একটি প্রকল্প দেওয়ার সময় তাঁর কাছ থেকে অগ্রিম ৪০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। কাজ সম্পন্ন হলেও এখনো বিল পরিশোধ করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। একই ধরনের অভিযোগ করেন সংরক্ষিত নারী সদস্য চম্পা রানী। তিনি জানান, ২ লাখ ৬৩ হাজার টাকার প্রকল্পের বিপরীতে তাঁর কাছ থেকেও ৪০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। ইউপি সদস্য মশিউর রহমান অভিযোগ করে বলেন, টি.আর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের বরাদ্দের বিপরীতে প্রতি লাখে ২০ হাজার টাকা দিতে বাধ্য করা হতো। আমিসহ একাধিক সদস্য টাকা দিয়েছি। অভিযোগে আরও বলা হয়, পরিষদের ওয়ান পার্সেন্ট” খাতের প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়া মাটি কাটার কাজের নামে ১২ জন ইউপি সদস্যের কাছ থেকে প্রায় ২ লাখ টাকা নেওয়া হয়। একজন গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে ৬০ জনের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা করে আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বরাদ্দকৃত ভিজিএফ চাল বিতরণের পর অবশিষ্ট ১৫ বস্তা চাল বিক্রির অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এছাড়া ভিজিএফের প্রায় ৪০০টি কার্ড প্রশাসকের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। অতিদরিদ্র কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে নাম অন্তর্ভুক্তির নামে জনপ্রতি ২৫ হাজার টাকা করে প্রায় ৩ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। ভিডব্লিউবি কার্ড প্রস্তুতের ক্ষেত্রে প্রতিটি কার্ডের জন্য ৫ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। মাতৃত্বকালীন ভাতার কার্ড করে দেওয়ার নামে ৩ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের ব্যাংক হিসাব থেকে ৪০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়া ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে দুই দফায় প্রায় ৬ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগও সামনে এসেছে। টিউবওয়েল, কাবিখা ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পেও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিচালিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

আরও পড়ুনঃ  রানীগঞ্জ রবিন মার্কেট বাজারে পাওয়া যাচ্ছে ০১ টাকায় লাউ। দিশেহারা কৃষক

 

 

নীলফামারী সদর উপজেলার গোড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদে ২০ নভেম্বর ২০২৫ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ৭ দিনব্যাপী অপ্রাতিষ্ঠানিক গবাদিপশু প্রশিক্ষণে ৬০০ টাকার পরিবর্তে ৫৫০ টাকা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে চাঁদের হাট হাই স্কুলে অনুষ্ঠিত ৭ দিনব্যাপী হাঁস-মুরগি প্রশিক্ষণে ৬০০ টাকার পরিবর্তে ৫৩০ টাকা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। চাঁদের হাট এলাকায় গবাদিপশু বিষয়ক প্রশিক্ষণে ৩০ জন প্রশিক্ষণার্থী দেখানো হলেও বাস্তবে অংশ নেন মাত্র ২২ জন। এতে প্রশিক্ষণ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া নাগরিকত্ব সনদ, প্রত্যয়নপত্র, ওয়ারিশান সনদ ও জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। যেখানে নাগরিকত্ব ও প্রত্যয়নপত্র বিনামূল্যে দেওয়ার কথা, সেখানে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জন্ম নিবন্ধনের জন্যও ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসকের নির্দেশে এক বহিরাগত যুবককে ইউনিয়ন পরিষদের দাপ্তরিক কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়। তাঁর মাধ্যমে জন্ম নিবন্ধন, প্রত্যয়নপত্র ও ওয়ারিশান সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হতো বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অভিযুক্ত ওই যুবকের নাম মোহাম্মদ শাওন ইসলাম। তিনি গোড়গ্রাম ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। গত ঈদুল ফিতর ২০২৫ উপলক্ষে ভিজিএফ চালের ভুয়া কার্ড তৈরির অভিযোগে তহিদুল ইসলামকে পুলিশ গ্রেফতার করে। উক্ত মামলাটি নিষ্পত্তি করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে নিজ হাতে লেখা কাগজে ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ১০০ টাকা দাবি করে। জানা যায় এ মামলা অর্থের বিনিময়ে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রশাসক আলমগীর হোসেন।

আরও পড়ুনঃ  রাজশাহীতে হত্যা চেষ্টা ও চাঁদাবাজি মামলার আসামি বেলাল হোসেন গ্রেপ্তার

 

 

এদিকে, গত ১২ মার্চ গোড়গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদে ইউপি সদস্য ও এলাকাবাসী প্রায় এক ঘণ্টা প্রশাসক আলমগীর হোসেনকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে অভিযোগের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাওয়ায় নীলফামারী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত ২৫ মার্চ ২০২৬ তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয় নীলফামারী সদর উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তাকে। এছাড়া সদস্য হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা ও প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে। তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকলেও ১০ মে ২০২৬ প্রশাসক আলমগীর হোসেনের পদত্যাগ এবং পরে বদলির আদেশ নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এদিকে মঙ্গলবার (১২ মে ২০২৬) দুপুর ১২টার দিকে নীলফামারী সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর ইউপি সদস্য ও সংরক্ষিত মহিলা সদস্যরা লিখিত অভিযোগ জমা দেন। দুর্নীতির টাকায় তিনি কালীতলা ক্যানেল থেকে প্রায় ৫০০ মিটার উত্তরে জমি ক্রয় করেছেন, ৫ তলা ভবনের ভিত্তি প্রস্তর করেছেন এবং ব্যবহার করছেন ৪ চাকার গাড়ি। স্থানীয়দের দাবি, তাঁর সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আরও পড়ুনঃ  ধুনটে আদালতের তোয়াক্কা না করে দোকানের সামনে বেড়া, বন্ধ বেচাকেনা