
নিজস্ব প্রতিবেদন, কিশোরগঞ্জ, ২ মে ২০২৬ টানা ভারী বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের হাজার হাজার একর বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অষ্টগ্রাম, ইটনা, মিঠামইন, হোসেনপুর, বাজিতপুর ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরে পাকা ও আধা-পাকা ধান ডুবে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন লাখো কৃষক।
বছরের একমাত্র ফসল চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অনেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ছয়টি উপজেলায় ৮৪৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এর মধ্যে অষ্টগ্রামে ৪৭০ হেক্টর, ইটনায় ২৫৩ হেক্টর, মিঠামইনে ১০০ হেক্টর, হোসেনপুর ৩০০ হেক্টর, বাজিতপুরে ১২ হেক্টর ও সদর উপজেলায় ১০ হেক্টর বোরো ধান ডুবে গেছে। যদিও কৃষকেরা বলছেন, ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ও আদমপুর ইউনিয়নের হাওরে অন্তত দুই হাজার হেক্টর বোরো জমির পাকা ধান এখন পানির নিচে।অষ্টগ্রামের কৃষক বেলাল ভূঁইয়া এ বছর ৩ একর জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। তিনি বলেন, “এই হাওরে আমার মতো অনেক কৃষকের একরের পর একর ধানি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। শিবপুর নদীসহ অন্যান্য নদীতে হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ না করলে আমরা ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ থেকে বাঁচতে পারবো না। নয়তো কৃষকরা না খেয়ে মারা যাবে”।
অনেক জায়গায় কৃষকরা গলাপানিতে নেমে মরিয়া হয়ে আধা-পাকা ধান কাটছেন। কেউ কেউ নৌকা দিয়ে কাটা ধান পাড়ে আনছেন, এতে শ্রমিক খরচ অনেক বেড়ে গেছে। আবার অনেক জমির ধান ইতোমধ্যে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে।কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ডা. সাদেকুর রহমান জানান, জেলার হাওরাঞ্চলে আবাদ করা ১ লাখ ৪ হাজার হেক্টর বোরো ধানের ৫০ শতাংশ কাটা শেষ হয়েছে। আগেই কৃষকদের ৮০ ভাগ ধান পাকলেই কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এখন আধাপাকা অবস্থায় ধান কাটতে মাইকিং করা হচ্ছে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে কাটা যাচ্ছে না।
মিঠামইন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ওবায়দুল ইসলাম খান অপু বলেন, “অতি বর্ষণের কারণে নিম্নাঞ্চলের জমিগুলোতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত পানি সরে না গেলে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন”।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর নাব্যতা হ্রাস, দুর্বল বেড়িবাঁধ, অকাল বৃষ্টি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্ষার আগেই হাওরে পানি ঢুকে পড়ছে। ২০১৭ ও ২০২২ সালের ভয়াবহ ক্ষতির পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতি বছর একই ধরনের পূর্বানুমেয় ঝুঁকির মুখে পড়ছেন কৃষকরা।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা দ্রুত সরকারি সহায়তা, ঋণ মওকুফ এবং হাওর রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দাবি জানিয়েছেন। নদী খনন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও আগাম সতর্কবার্তা কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
যে হাওরের নতুন ধানে বাড়িতে বাড়িতে উৎসব হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন কেবলই কান্না অনিশ্চয়তার কালো মেঘ।
প্রতিবেদকের নাম 

















