
মোঃ কাইয়ুম হাসান, স্টাফ রিপোর্টার, ঠাকুরগাঁও
১৩ বছর ধরে চার দেয়ালের মাঝে বন্দি জীবন পার করছেন ঐশী। সাজা ভোগ করছেন নিজের বাবা-মা হত্যার দায়ে। কারাগারের লাইব্রেরিয়ান হিসেবে দায়িত্ব পালন আর ইংরেজি সাহিত্য পড়ার মাঝে সময় কাটলেও তার অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘশ্বাস।
৩০ বছরের সাজা প্রাপ্ত এই তরুণী যখন মুক্ত হবেন, তখন তার বয়স হবে ৪৯। কারাগারের এই দীর্ঘ সময় এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা কেবল একজন মানুষের একার নয়, বরং এটি একটি সমাজের জন্য গভীর ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঐশীর গল্পটি কেবল একটি অপরাধের চিত্র নয়, এটি একটি করুণ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একজন মানুষ যে নিজের হাতেই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছে তার আশ্রয়স্থল—বাবা-মাকে, তার পরবর্তী জীবন কাটে এক গভীর শূন্যতায়।
সাধারণ বন্দিদের জন্য মুক্তির পর স্বজনদের অপেক্ষা থাকে, কিন্তু ঐশীর জন্য সেই অপেক্ষায় নেই কেউ। নেই বাবা, নেই মা—যাদের অস্তিত্বই সে মুছে দিয়েছিল নিজের হাতে। এই নির্মম বাস্তবতা যেমন অপরাধের ভয়াবহতা মনে করিয়ে দেয়, তেমনি প্রশ্ন তোলে আমাদের পারিবারিক কাঠামোর গভীরতা নিয়েও।
সম্প্রতি এই বিষাদময় বাস্তবতার সঙ্গে দক্ষিণ ভারতীয় নির্মাতা গুণশেখরের ‘ইউফোরিয়া’ সিনেমার গল্পের এক অদ্ভুত সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। সারা অর্জুন ও ভূমিকা চাওলা অভিনীত এই সিনেমাটিতে সন্তানের ভুল পথে চলে যাওয়া এবং সেই সংকট মোকাবিলায় মা-বাবার ভূমিকা ও নৈতিকতার এক অনন্য বয়ান উঠে এসেছে।
সিনেমার বার্তা অনুযায়ী, বাবা-মায়ের সঠিক মনোযোগ ও দিকনির্দেশনার অভাবে সন্তান অনেক সময় বিপথগামী হয়, কিন্তু অপরাধের পর সঠিক উপলব্ধি, অনুশোচনা এবং ক্ষমা পাওয়ার পথগুলোও সমাজ ও পরিবারের ওপর নির্ভর করে।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, ঐশীর বর্তমান দশা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সন্তান বড় করার প্রক্রিয়ায় কেবল অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের মানসিক সেতুবন্ধন। বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ববোধ এবং সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের মানসিক সমর্থন—এই দুইয়ের ভারসাম্যহীনতাই অনেক ক্ষেত্রে বড় ধরণের ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়।
সমাজ থেকে এমন নির্মম পরিণতি ঠেকাতে হলে প্রয়োজন সচেতনতা। সাহিত্য, নাটক এবং সিনেমার মতো শক্তিশালী গণমাধ্যমগুলোকে বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্কের জটিলতা, মানসিক দূরত্ব এবং সংবেদনশীলতা নিয়ে আরও বেশি কাজ করতে হবে।
সমাজে যদি নিয়মিত এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়, তবেই হয়তো ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন প্রজন্মের পথচলা সুন্দর হতে পারে।
অন্যথায়, এমন অন্ধকার কক্ষ থেকে বারবার বেরিয়ে আসবে এমন সব ট্র্যাজিক সংবাদ—‘কারাগারে কেটেছে ১৩ বছর, আরও ১৭ বছরের অপেক্ষা’।
সময়ের প্রয়োজনে আমাদের ভাবতে শিখতে হবে—আমরা সন্তানদের কী দিচ্ছি, আর তাদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করছি। এই উপলব্ধিটুকুই হতে পারে আগামীর সুন্দর ও সহিংসতামুক্ত সমাজ গড়ার প্রথম ধাপ।
প্রতিবেদকের নাম 

















