Dhaka ০৭:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
শব্দদূষণ রোধে ডিএমপির কঠোর অভিযান নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের দাবিতে বাসভবনের সামনে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের অবস্থান ইপিজেডের নিউ মুরিং মীরা পাড়ায় জুয়ার আসর থেকে ১১ জনকে আটক করেছে পুলিশ তারাগঞ্জে ইউএনও ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সাথে ‘দৈনিক আজকের জনবাণী’র স্টাফ রিপোর্টারের সৌজন্য সাক্ষাৎ মাদারগঞ্জে উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত কাজিপুরের যমুনা নদীতে বিপদসীমার উপরে পানি হওয়ায় দিশেহারা জনগণ খেলতে গিয়ে পুকুরে ডুবে তিন শিশুর মৃত্যু, কাহালুতে হৃদয়বিদারক ঘটনা ফরিদপুরে নাঈম হত্যা মামলায় দুই আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হোসেনপুরে আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত করতোয়ার করাল গ্রাসে কুলানন্দনপুর আশ্রয়ণ প্রকল্প, আতঙ্কে শতাধিক পরিবার

ডিমলায় অস্তিত্ব সংকটে চার শাখা নদী: পুনঃখনন ও অবৈধ দখল উচ্ছেদের আকুল দাবি

আরিফ ইসলাম আলাল, ডিমলা উপজেলা প্রতিনিধি:

তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের আওতাধীন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার নাউতার, বুড়িতিস্তা, কুমলাই ও ধুম নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে। একসময় সারা বছর প্রবাহমান এসব শাখা নদী বর্তমানে দখল, পলি জমে ভরাট এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে অনেকাংশে মরা খালে পরিণত হয়েছে। এতে কৃষি, সেচ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। স্থানীয়দের মতে, নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে পরিকল্পিত পুনঃখনন, দখল উচ্ছেদ এবং কার্যকর নজরদারির বিকল্প নেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, নাউতার ও ধুম নদীর বিভিন্ন অংশে পানি প্রবাহ প্রায় নেই বললেই চলে। নদীর তলদেশে পলি ও বালু জমে চর সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও ধানসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হচ্ছে, আবার কোথাও প্রভাবশালীরা নদীর জায়গা দখল করে স্থায়ী ব্যবহার শুরু করেছেন। কিছু এলাকায় ট্রাক্টর দিয়ে মাটি ও বালু কেটে নেওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতে নাউতার ও ধুম নদীতে পুনঃখনন করা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী সুফল বয়ে আনেনি। খনন শেষে উত্তোলিত বালু ও মাটি নদীর তীরেই ফেলে রাখায় বর্ষার পানিতে সেগুলো আবার নদীগর্ভে ফিরে গিয়ে নাব্যতা নষ্ট করেছে। ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই নদীগুলো আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
নদী ঘিরে অবৈধ বালু উত্তোলনও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রভাবশালী একটি চক্র রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন করছে। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতে নদী পুনঃখননের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয়নি। নামমাত্র কাজ করে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি করা হলেও বাস্তবে নদীর স্থায়ী উন্নয়ন হয়নি। এ বিষয়ে তারা পূর্বের প্রকল্পগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছোট নদ-নদী ও জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নাউতার ও ধুম নদীর প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকায় পুনঃখনন করা হয়। প্রকল্পটি ২০২২ সালে শেষ হয়। তবে খনন-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং নদীতীরেই উত্তোলিত বালু-মাটি ফেলে রাখার কারণে নদীগুলো দ্রুত পুনরায় ভরাট হয়ে পড়ে।
এদিকে কুমলাই নদীর উৎসমুখে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণে নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বুড়িতিস্তা নদীও নাব্যতা সংকট ও দখলের কারণে অস্তিত্বের সংকটে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নদী দখলকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং এলজিইডির সমন্বয়ে কয়েকটি নদীর সীমানা নির্ধারণ ও অবৈধ দখলদার চিহ্নিত করার কাজ চলছে। কুমলাই নদীতে শতাধিক দখলদারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিনিধিরাও নাউতার ও ধুম নদীর পরিস্থিতি পরিদর্শন করেছেন।
‘রিভারাইন পিপল’-এর পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, নদী পুনঃখনন অবশ্যই বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে হতে হবে। শুধু খনন করলেই হবে না, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত না করলে অল্প সময়েই তা আবার ভরাট হয়ে যাবে।
ডালিয়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরি বলেন, এ অঞ্চলের নদীগুলোতে বালুর পরিমাণ বেশি থাকায় পুনঃখননের পর দ্রুত পলি জমে যায়। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, নদীগুলোর সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং পরিকল্পিত পুনঃখননের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।
পরিবেশবিদ ও স্থানীয়দের মতে, নদীগুলোকে টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং, অবৈধ দখল ও বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, পুনঃখনন প্রকল্পের স্বচ্ছ বাস্তবায়ন এবং খনন-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে উত্তরাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ শাখা নদীগুলোর অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

আরও পড়ুনঃ  নাগরপুরে ইমাম-মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের সঙ্গে মতবিনিময় করলেন এমপি লাভলু
Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

শব্দদূষণ রোধে ডিএমপির কঠোর অভিযান

ডিমলায় অস্তিত্ব সংকটে চার শাখা নদী: পুনঃখনন ও অবৈধ দখল উচ্ছেদের আকুল দাবি

আপডেটের সময়: ১২:২৬:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

আরিফ ইসলাম আলাল, ডিমলা উপজেলা প্রতিনিধি:

তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের আওতাধীন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার নাউতার, বুড়িতিস্তা, কুমলাই ও ধুম নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে। একসময় সারা বছর প্রবাহমান এসব শাখা নদী বর্তমানে দখল, পলি জমে ভরাট এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে অনেকাংশে মরা খালে পরিণত হয়েছে। এতে কৃষি, সেচ, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। স্থানীয়দের মতে, নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে পরিকল্পিত পুনঃখনন, দখল উচ্ছেদ এবং কার্যকর নজরদারির বিকল্প নেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, নাউতার ও ধুম নদীর বিভিন্ন অংশে পানি প্রবাহ প্রায় নেই বললেই চলে। নদীর তলদেশে পলি ও বালু জমে চর সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও ধানসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হচ্ছে, আবার কোথাও প্রভাবশালীরা নদীর জায়গা দখল করে স্থায়ী ব্যবহার শুরু করেছেন। কিছু এলাকায় ট্রাক্টর দিয়ে মাটি ও বালু কেটে নেওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতে নাউতার ও ধুম নদীতে পুনঃখনন করা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী সুফল বয়ে আনেনি। খনন শেষে উত্তোলিত বালু ও মাটি নদীর তীরেই ফেলে রাখায় বর্ষার পানিতে সেগুলো আবার নদীগর্ভে ফিরে গিয়ে নাব্যতা নষ্ট করেছে। ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই নদীগুলো আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
নদী ঘিরে অবৈধ বালু উত্তোলনও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রভাবশালী একটি চক্র রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন করছে। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তনের পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতে নদী পুনঃখননের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয়নি। নামমাত্র কাজ করে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি করা হলেও বাস্তবে নদীর স্থায়ী উন্নয়ন হয়নি। এ বিষয়ে তারা পূর্বের প্রকল্পগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছোট নদ-নদী ও জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নাউতার ও ধুম নদীর প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকায় পুনঃখনন করা হয়। প্রকল্পটি ২০২২ সালে শেষ হয়। তবে খনন-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং নদীতীরেই উত্তোলিত বালু-মাটি ফেলে রাখার কারণে নদীগুলো দ্রুত পুনরায় ভরাট হয়ে পড়ে।
এদিকে কুমলাই নদীর উৎসমুখে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণে নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বুড়িতিস্তা নদীও নাব্যতা সংকট ও দখলের কারণে অস্তিত্বের সংকটে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নদী দখলকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং এলজিইডির সমন্বয়ে কয়েকটি নদীর সীমানা নির্ধারণ ও অবৈধ দখলদার চিহ্নিত করার কাজ চলছে। কুমলাই নদীতে শতাধিক দখলদারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিনিধিরাও নাউতার ও ধুম নদীর পরিস্থিতি পরিদর্শন করেছেন।
‘রিভারাইন পিপল’-এর পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, নদী পুনঃখনন অবশ্যই বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে হতে হবে। শুধু খনন করলেই হবে না, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত না করলে অল্প সময়েই তা আবার ভরাট হয়ে যাবে।
ডালিয়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরি বলেন, এ অঞ্চলের নদীগুলোতে বালুর পরিমাণ বেশি থাকায় পুনঃখননের পর দ্রুত পলি জমে যায়। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, নদীগুলোর সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং পরিকল্পিত পুনঃখননের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।
পরিবেশবিদ ও স্থানীয়দের মতে, নদীগুলোকে টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং, অবৈধ দখল ও বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, পুনঃখনন প্রকল্পের স্বচ্ছ বাস্তবায়ন এবং খনন-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে উত্তরাঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ শাখা নদীগুলোর অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

আরও পড়ুনঃ  ধুনটে বিশেষ অভিযানে ৪৮টি অবৈধ চায়না দুয়ারী জাল জব্দ, জনসম্মুখে পুড়িয়ে ধ্বংস