
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ সেমাইকে সাধারণত উৎসবকেন্দ্রিক পণ্য মনে করা হয়। কিন্তু সারা বছরই বাসাবাড়ির ছোটোখাটো নানা আয়োজনে এই পণ্যের কদর থাকে। তবে বিক্রেতারা জানাচ্ছেন, সেমাই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় দুই ঈদের সময়। আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশের বাজারে সেমাই বিক্রি বেড়েছে বহুগুণ। ঘরে ঘরে ঐতিহ্যবাহী ঈদের খাবার হিসেবে সেমাইয়ের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় খুচরা বাজারে দাম কিছুটা বেড়েছে। ঈদের আমেজে সেমাইয়ের বাজার জমে উঠলেও দাম বৃদ্ধির কারণে কিছুটা চাপে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। তবে উৎসবের আনন্দে প্রিয় এ খাবার কিনতে আগ্রহের কমতি নেই কারো মধ্যেই। জানা গেছে, দেশে সেমাইয়ের বার্ষিক চাহিদা ২০ থেকে ২৫ হাজার টন। অর্থ মূল্যে এই বাজার প্রায় ২০০ কোটি টাকার বেশি। প্রতিবছরই সেমাইয়ের চাহিদা বাড়ছে। দেশে ৪০টির বেশি কোম্পানি রয়েছে, যারা তাদের উৎপাদিত সেমাই মোড়কজাত করে বিক্রি করে। এসব কোম্পানির বাইরে অনেক মৌসুমি প্রতিষ্ঠান উৎসবকেন্দ্রিক খোলা ও মোড়কজাত সেমাই উৎপাদন করে।
দেশে বর্তমানে খোলা সেমাইয়ের তুলনায় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সেমাইয়ের ক্রেতার সংখ্যা বাড়ছে। ভালো সেমাই উৎপাদন করে এমন পরিচিতি পাওয়া ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে বনফুল, প্রাণ, কিষোয়ান, কুলসন, ওয়েল ফুড ও স্কয়ার অন্যতম। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা বিভিন্ন কোম্পানি সেমাই তৈরি করে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিবছর দেশে ঈদের সময় সেমাইয়ের চাহিদা বাড়ে। চাহিদার সঙ্গে দামও বেড়েছে। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেমাইয়ের দাম বেড়েছে। গমের আটা, চিনি ও জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়াও এর কারণ। তবে দাম বাড়লেও ঈদের মৌসুমে সেমাইয়ের ভালো বেচাকেনা হবে বলে আশা তাদের আজ বুধবার রাজধানীর সূত্রাপুর, রায়সাহেব বাজার ও নয়াবাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে বিভিন্ন দোকানে ক্রেতাদের ভিড় দেখা গেছে। পরিবার-পরিজনের জন্য আগেভাগেই কেনাকাটা সেরে ফেলতে চাইছেন অনেকে। বাজারগুলোতে লাচ্ছা ও চিকন– এ দুই ধরনের সেমাই পাওয়া যায়। এর মধ্যে লাচ্ছা সেমাইয়ের চাহিদা বেশি। আগে বাজারে সনাতন পদ্ধতিতে তৈরি খোলা সেমাইয়ের প্রাধান্য থাকলেও এখন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোড়কজাত সেমাই বেশি বেচাকেনা হতে দেখা গেছে।
তবে গত বছরের তুলনায় এবার প্যাকেটজাত সেমাইয়ের দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা ও খোলা সেমাইয়ের দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেশি। বিশেষ করে লাচ্ছা সেমাই ও ঘি-ভাজা সেমাইয়ের চাহিদা বেশি থাকায় এসব পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি বেড়েছে। প্যাকেটজাত ব্র্যান্ডের লাচ্ছা সেমাইয়ের ৫০০ গ্রামের প্যাকেট মান ও ব্র্যান্ডভেদে ৪৫০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। যা গত বছর ৪০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে ছিল। আর লাচ্ছা সেমাইয়ের ২০০ গ্রামের প্যাকেট ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যেমন বনফুলের ২০০ গ্রামের প্রতি প্যাকেট লাচ্ছা সেমাইয়ের দাম রাখা হচ্ছে ৫০ টাকা করে। একই দামে বিক্রি হচ্ছে প্রাণের মেট্রো ও প্রিন্স ব্র্যান্ডের ২০০ গ্রাম সেমাইয়ের প্যাকেট। আর কুলসন ব্র্যান্ডের ২০০ গ্রামের প্যাকেট বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা করে। এছাড়া খোলা লাচ্ছা সেমাই বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি মানভেদে ১৮০ টাকা থেকে ২৪০ টাকায়। খোলা চিকন সেমাইও অনেকটা কাছাকাছি দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে। আর বাংলা সেমাই নামে পরিচিত সাধারণ মানের সেমাই বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে।
রায়সাহেব বাজারের আদর স্টোরের মালিক মো. মাহিয়ান ইসলাম মহিম বলেন, সেমাই মূলত উৎসব ও অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক পণ্য। অর্থাৎ সারা বছর বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সেমাই বিক্রি হয়। তবে সেমাইয়ের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে দুই ঈদের সময়। তিনি বলেন, ২৭ রমজান থেকে সেমাই, চিনি, বাদাম ও কিশমিশ বেচাবিক্রি বেড়ে যায়। এবছরও বিক্রি যেমন বেড়েছে তেমনি দামও বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার মানভেদে বিভিন্ন ব্র্যান্ডভেদে প্যাকেটজাত সেমাইয়ের দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। খোলা সেমাইয়ের দামও কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। তবে ২০০ গ্রামের যে ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত সেমাই রয়েছে, সেটার দাম আগের মতোই ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সে কারণে সেটার চাহিদাও বেশি থাকে। সূত্রাপুর বাজারে আদনান স্টোরের মো. আরিফ হোসেন বলেন, সাধারণত রোজার শেষ ১০ দিনে মানুষ মুদি দোকানে ঈদের পণ্য কিনতে আসেন। আর দোকানে আসা প্রত্যেকেই সেমাই কেনেন। আগে চিকন সেমাই বেশি বিক্রি হতো। এখন মানুষ লাচ্ছা সেমাই বেশি কেনেন। গত এক বছর ব্যবধানে সেমাইয়ের দাম কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
নয়াবাজারে সেমাই নিতে আসা মো. শাহেদ বেপারী বলেন, ঈদে অতিথি আপ্যায়ন মানেই সেমাই পরিবেশন করতে হবে। তাই সেমাই ঈদের অত্যাবশ্যকীয় পণ্যে পরিণত হয়েছে। আর পুরান ঢাকাতে কত রকমের সেমাই দিয়ে আপ্যায়ন হয়ে থাকে সেটা না দেখলে বোঝানো যাবে না। সেজন্য বাজার থেকে কয়েক রকমের সেমাই কিনেছি তিনি বলেন, এ বছর দাম একটু বেশি মনে হয়েছে। গত বছর অলিম্পিক কোম্পানির ৫০০ গ্রামের যে প্যাক নিয়েছি ৫৫০ টাকায় আজ সেটা নিতে হচ্ছে ৭০০ টাকা দিয়ে। এছাড়া খোলা লাচ্ছা সেমাই বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২২০ টাকা কেজি। শুধু ২০০ গ্রামের প্যাকেট সেমাইয়ের দাম আগের মতো রয়েছে। ঈদে অতিথি আপ্যায়নে সেমাই অপরিহার্য হওয়ায় দাম কিছুটা বাড়লেও কিনতেই হচ্ছে। ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, চাহিদা বাড়ার সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়াচ্ছে কি না সেটিও নজরদারিতে রাখা জরুরি। তারা বাজার মনিটরিং জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। কোথাও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিবেদকের নাম 

























