
এইচ. এম. হাসান আল মামুন লিমন : সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় পল্লী উন্নয়ন সমবায় ফেডারেশন
বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়নের ইতিহাসে সমবায় একটি পরীক্ষিত ও শক্তিশালী উন্নয়ন কাঠামো। কৃষক, শ্রমজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তি, উৎপাদন বৃদ্ধি, সঞ্চয় গঠন এবং সামাজিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে সমবায় আন্দোলন যুগ যুগ ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। বিশেষ করে উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি (ইউসিসিএ) দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে।কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস উপলক্ষে গঠিত উপজেলা পর্যায়ের উদযাপন কমিটিতে ইউসিসিএর নির্বাচিত সভাপতিদের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যে দিবসের মূল উদ্দেশ্য পল্লী উন্নয়ন কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা, সেই দিবসের কমিটিতেই পল্লী উন্নয়নের অন্যতম অংশীদার প্রতিষ্ঠানকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং সমবায় আন্দোলনের প্রতি এক ধরনের অবমূল্যায়ন।
প্রশ্ন হচ্ছে, পল্লী উন্নয়নের কথা বলা হবে, অথচ সমবায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকবে না—এ কেমন উন্নয়ন দর্শন? দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত কৃষক সমবায়, সেচ সমবায়, উৎপাদন সমবায় ও বিভিন্ন তৃণমূল সংগঠনের সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান হলো ইউসিসিএ। নির্বাচিত সভাপতিরা হাজার হাজার সমবায়ী সদস্যের প্রতিনিধি। তাদের বাদ দিয়ে পল্লী উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা বা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে না।বাংলাদেশে পল্লী উন্নয়নের যে ঐতিহাসিক ধারা, সেখানে ড. আখতার হামিদ খানের কুমিল্লা মডেল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমবায়ভিত্তিক কৃষি উন্নয়নের চিন্তা এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন দর্শন—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জনগণের অংশগ্রহণ এবং সমবায়। সেই ঐতিহ্যের ধারক-বাহক প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি আজ রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে প্রান্তিক করে দেওয়া হয়, তবে তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়; বরং সমবায়ভিত্তিক উন্নয়ন দর্শনেরই অবমূল্যায়ন।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবসের কমিটিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের স্থান দেওয়া হলেও সমবায় নেতৃত্বকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এটি এক ধরনের বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বহন করে। সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সরকারের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।আজ যখন সরকার কৃষি আধুনিকীকরণ, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের কথা বলছে, তখন সমবায়কে আরও শক্তিশালী ও অংশীদারিত্বমূলক ভূমিকায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নীতিনির্ধারণী ও উদযাপনমূলক কার্যক্রমে সমবায়ের প্রতিনিধিত্ব ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে সমবায় আন্দোলনের জন্য শুভ সংকেত নয়।আমরা মনে করি, জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস উদযাপন কমিটির বর্তমান কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। উপজেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ইউসিসিএর নির্বাচিত সভাপতিকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলে কমিটি আরও প্রতিনিধিত্বশীল, কার্যকর এবং অংশগ্রহণমূলক হবে। এর মাধ্যমে সরকারের পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচিও অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা ও সফলতা অর্জন করবে।
সমবায়কে বাদ দিয়ে পল্লী উন্নয়নের কথা বলা যায়, কিন্তু প্রকৃত পল্লী উন্নয়ন অর্জন করা যায় না। কারণ সমবায় কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি গ্রামীণ মানুষের আশা, অংশীদারিত্ব ও আত্মনির্ভরতার আন্দোলন। সেই আন্দোলনের প্রতিনিধিদের উপেক্ষা করা মানে পল্লী উন্নয়নের ভিত্তিকেই দুর্বল করা।জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস হোক সকল অংশীজনের মিলনমেলা। সেখানে সমবায়ের যথাযথ মর্যাদা ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হোক—এটাই আজ সময়ের দাবি।
প্রতিবেদকের নাম 























