
মোঃ রমজান আলী, আটোয়ারী উপজেলা প্রতিনিধি (পঞ্চগড়)
একটা সময় ছিল যখন হাট-বাজারে বিড়ি কোম্পানিগুলো তাদের ব্র্যান্ডের নাম ও লোগো সংবলিত গেঞ্জি গরিব হাটুরিয়া বা সাধারণ মানুষের মাঝে বিলি করত। গায়ে একটা কাপড়ের প্রয়োজনে অনেকেই খুশি মনে সেই গেঞ্জি গায়ে চাপাতেন। মানুষটি না বুঝেই হয়ে উঠতেন বিড়ি কোম্পানির এক একজন জীবন্ত বিজ্ঞাপন বা ‘মোবাইল বিলবোর্ড। কালের বিবর্তনে বিজ্ঞাপনের সেই একই কৌশল এখন ভর করেছে চিকিৎসা পেশায়। পঞ্চগড় জেলায় সম্প্রতি একটি ক্লিনিক ও কিছু চিকিৎসকের পক্ষ থেকে এমন অভিনব অথচ বিতর্কিত প্রচারণার খবর পাওয়া গেছে এবং সরজমিনে দেখা গেছে। যেখানে সাধারণ মানুষের গায়ে জড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে চিকিৎসকের নাম, ডিগ্রি ও ক্লিনিকের নাম সংবলিত গেঞ্জি।
সেবামূলক ও মহৎ এই পেশার এমন বাণিজ্যিক প্রচার সাধারণ মানুষের মনে যেমন কৌতুহল সৃষ্টি করেছে, তেমনি চিকিৎসকদের একাংশ ও সচেতন মহলে তুলেছে নৈতিকতার প্রশ্ন। চিকিৎসকের ডিগ্রি যখন গেঞ্জির বুকে: সচেতনতার নামে সস্তা প্রচার?
পঞ্চগড়ের বিভিন্ন হাট-বাজার ও গ্রামীণ এলাকায় সাধারণ মানুষদের গায়ে এমন গেঞ্জি দেখা যাচ্ছে, যার সামনে বা পেছনে বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে স্থানীয় কোনো চিকিৎসকের নাম, তাঁর অর্জিত ডিগ্রি এবং সংশ্লিষ্ট ক্লিনিকের ঠিকানা। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শহরের এক শিক্ষক এক চিকিৎস বলেন, “বিড়ি কোম্পানি বা কোনো বাণিজ্যিক পণ্যের প্রচার আর একজন চিকিৎসকের নামের প্রচার এক হতে পারে না। চিকিৎসাসেবা একটি মহান পেশা। এভাবে মানুষের গায়ে নাম লিখে ব্র্যান্ডিং করাটা এই পেশার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে। এটি কি চিকিৎসকদের জন্য অপমানজনক? চিকিৎসকদের নাম ও ডিগ্রি এভাবে গেঞ্জিতে লিখে প্রচার করাটা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের জন্য কতটা মর্যাদাপূর্ণ বা অপমানজনক—তা নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন।
চিকিৎসা নীতিশাস্ত্র (Medical Ethics) অনুযায়ী, চিকিৎসকদের নিজেদের প্রচারের ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট নিয়মনীতি মেনে চলতে হয়। মাইকিং করে, দেয়ালে চিকা মেরে বা গেঞ্জি বিলি করে সস্তা প্রচারণাকে সাধারণত এই পেশায় নিরুৎসাহিত করা হয়।
অনেকে মনে করছেন, ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে চিকিৎসকদের নাম ব্যবহার করে এই গেঞ্জিগুলো তৈরি করছে। কিন্তু চিকিৎসকরা নিজেরা জেনে বা না জেনে এই প্রচারণায় সায় দিয়ে প্রকারান্তরে নিজেদের মর্যাদাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। একজন চিকিৎসকের যোগ্যতা ও পরিচিতি তৈরি হয় তাঁর চিকিৎসার মান ও রোগীর সুস্থতার মাধ্যমে, কোনো ফ্রি গেঞ্জির বিজ্ঞাপনে নয়।
সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ
বিড়ি কোম্পানির মতোই এই প্রচারণায় টার্গেট করা হচ্ছে গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত সাধারণ মানুষকে। অভাবের সংসারে একটি ফ্রি গেঞ্জি পাওয়া অনেকের জন্যই আনন্দের। কিন্তু সেই গেঞ্জিটি গায়ে দিয়ে তিনি যখন পথে-ঘাটে ঘুরছেন, তখন তিনি অজান্তেই একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনী হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছেন। মানুষের এই সরলতা ও আর্থিক অসচ্ছলতাকে পুঁজি করে এমন প্রচারণা কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সমালোচনা শুরু হয়েছে। সচেতন নাগরিক মহল বলেন চিকিৎসা কোনো সাধারণ পণ্য নয় এবং রোগীরা কোনো ক্রেতা নন। পঞ্চগড়ে শুরু হওয়া এই ‘গেঞ্জি বিজ্ঞাপন’ সংস্কৃতি যদি এখনই বন্ধ করা না হয়, তবে চিকিৎসা পেশার প্রতি মানুষের যে ন্যূনতম শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস রয়েছে, তা আরও সংকটের মুখে পড়বে। এই বিষয়ে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ ও সচেতন চিকিৎসকদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন পঞ্চগড়ের সচেতন মহল।
প্রতিবেদকের নাম 



















