Dhaka ১১:৪০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
বান্দরবানে উন্নয়ন ও সমন্বয় জোরদারে বিশেষ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত দ্রুতই প্রাথমিকে ৬০ হাজার শিক্ষক নিয়োগ: শিক্ষামন্ত্রী মার্কিন নৌ-অবরোধ না তুললে লোহিত সাগরের বাণিজ্য পথ বন্ধের হুমকি ইরানের উন্নয়ন অংশীদারদের কাছে ২০০ কোটি ডলার সহায়তা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী এসএসসি ও এসএসসি ভোকেশনাল পরীক্ষা নকলমুক্ত পরিবেশে সম্পন্ন করতে হোসেনপুরে মতবিনিময় সভা ডলুপাড়ায় সাংগ্রাইয়ের জলকেলি: মন্ত্রী-এমপির উপস্থিতিতে সম্প্রীতির মহোৎসব লাল মুক্তিবার্তা ও ভারতীয় তালিকা থেকে ৬৪৭৬ ‘ভুয়া’ মুক্তিযোদ্ধা বাদ ধামইরহাটে স্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বামীকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এলজিইডি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ: নীরব দপ্তর, ক্ষোভে ফুঁসছে স্থানীয়রা প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা-২০২৫

গণতন্ত্র বিকাশ ও ধ্বংসের ৩৫ বছর

  • প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেটের সময়: ০৮:২৪:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১২৪ সময় দেখুন

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর আগেও ১৯৯১ সালে একবার দেশে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল। আর দেশে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। আসন্ন নির্বাচনের ডামাডোলে সবার আগ্রহ কেমন ছিল বিগত সময়ে দলীয় ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনগুলো, কোন নির্বাচন পেয়েছে গ্রহণযোগ্যতা, কোন নির্বাচন কী নামে খ্যাতি-কুখ্যাতি পেয়েছে। ১৯৯০ সালের ১৯ নভেম্বর একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে সই করেছিল বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনকারী রাজনৈতিক দলগুলো। চার দফা ওই ঘোষণায় ছিল, এরশাদের অধীনে সব নির্বাচন বয়কট ও প্রতিহত করা; এরশাদের পদত্যাগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর; অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর এবং গণমাধ্যমকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।

তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এরপর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দেশে প্রথম কোনো অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় সংসদ নির্বাচন। এর আগে সংসদ নির্বাচন কিংবা গণভোট বা অন্য কোনো নির্বাচন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হয়নি। দেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, প্রথম এই অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন। ওই সরকারের প্রশাসন ছিল সবচেয়ে বেশি নিরপেক্ষ। কেমন ছিল দেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও পরবর্তী দুই নির্বাচন ১৯৯১ সালে সরকার গঠনের পর তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি পরবর্তী নির্বাচনগুলোর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনেনি। ফলে ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আবার সংকট তৈরি হয়।

আরও পড়ুনঃ  গণভোটের রায় বাস্তবায়নে প্রয়োজনে আবারও জীবন দেবো: ডা. শফিকুর রহমান

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ফ্রিডম পার্টিকে নিয়ে একতরফা নির্বাচন করে বিএনপি। ওই নির্বাচনে বিএনপি ২৭৮টি আসনে জয়লাভ করে। বাকি আসনগুলোর একটি আসনে ফ্রিডম পার্টি, ১০টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হন, ১০টি আসনের ফলাফল অসমাপ্ত ছিল এবং একটি আসনের নির্বাচন আদালতের আদেশে স্থগিত হয়। তৎকালীন সরকারদল বিএনপির অধীনে হওয়া ওই নির্বাচন বয়কট করেছিল আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। আন্দোলনের মুখে ওই সংসদ টিকেছিল মাত্র ১১ দিন। নির্বাচন নিয়ে অবিশ্বাস, কারচুপির সমাধান হিসেবে দেশে প্রথমবারের মতো গঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন দেশে প্রথম কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ সংসদের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসনে জয়লাভ করে। অন্য দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ১১৬টি, জাতীয় পার্টি ৩২টি এবং জামায়াতে ইসলামী তিনটি আসনে জয়ী হয়।

এই নির্বাচনও দেশি ও আন্তর্জাতিক মহলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। পরে ২০০১ সালে এবং ২০০৮ সালে অষ্টম এবং নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে ১৯৩টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। অন্য দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ ৬২টি, জামায়াতে ইসলামী ১৭টি এবং জাতীয় পার্টি ও ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ১৪টি আসনে জয়ী হয়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এটি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ভোট। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। অন্য দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ৩০টি, জাতীয় পার্টি ২৭টি এবং জামায়াতে ইসলামী দুটি আসনে জয়ী হয়। এই তিনটি নির্বাচনে পরাজিতরা কারচুপির অভিযোগ আনলেও সবাই ভোটের ফলাফল মেনে নেয়। নির্বাচনগুলো সবার কাছে মোটামুটি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল।

আরও পড়ুনঃ  কৃষিভিত্তিক কলকারখানা গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে : প্রধানমন্ত্রী

কেমন ছিল দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনগুলো ২০০৮-এর নির্বাচনে সরকার গঠনের পর ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬ সালে জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা আওয়ামী লীগ এর পেছনে যুক্তি হিসেবে আনে—এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অসাংবিধানিক। পরবর্তীকালে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দলীয় সরকারের অধীনে একতরফা নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ। এ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একাই ২৩৪টি আসন পায়, যার মধ্যে ১৫৩টি আসনে তারা জয়ী হয় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। দশম জাতীয় সংসদের এই নির্বাচন ‘বিনা ভোটের নির্বাচন’ নামে পরিচিত।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য করার আশ্বাস দিয়ে বিএনপিসহ বড় বড় দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানায় আওয়ামী লীগ। কিন্তু পরে বিবিসিসহ সংবাদমাধ্যমের খবরে দেখা যায়, নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরুর আগেই ব্যালটভর্তি বাক্স নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রে। অর্থাৎ রাতেই ব্যালট দিয়ে বাক্স ভরে রাখা হয়। ফলে ওই নির্বাচনটি ‘নিশিরাতের ভোট’ বলে পরিচিতি পায়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৫৮টি আসন পায়। জাতীয় পার্টি ২২টি এবং মহাজোটভুক্ত অন্য দলগুলো আটটি আসনে জয়ী হয়। অপরদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত বিএনপি ছয়টি, গণফোরাম দুটি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তিনটি আসনে জয়ী হন। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট বয়কট করেছিল (জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন ছিল না)।

আরও পড়ুনঃ  সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীর সংখ্যা ৬০০

২০১৪ সালের মতো ‘বিনা ভোটে’ আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা যেন জয়ী না হয়, সেই ‘বিব্রতকর’ পরিস্থিতি এড়াতে এবার অভিনব কৌশল নেয় আওয়ামী লীগ। ডামি প্রার্থী হিসেবে নিজ দলের নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করায় দলটি। ফলে এই নির্বাচনটি পরিচিত পায় ‘আমি-ডামি নির্বাচন’ নামে। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২২২টি আসন, জাতীয় পার্টি (জাপা) ১১টি আসন এবং জাসদ, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি একটি করে আসন জয়ী হয়। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন ৬২ জন, যাদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ নেতা। এই সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র সাত মাস। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় এবং দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এরপর থেকে দেশ পরিচালনা করছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারের অধীনে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফিরেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে কার্যকর আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করলেও বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে এর প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল। তারা আন্দোলন-সংগ্রামে বরাবরই ত্ত্ত্বাবধায়ক সরকার বহালের দাবি তুলে আসছিল। ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করে রায় ঘোষণা করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর মধ্য দিয়ে ২০১১ সালে আদালতের রায়ে বাতিল হওয়া সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার আবার ফিরে এসেছে। আগামী চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে কার্যকর হবে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

বান্দরবানে উন্নয়ন ও সমন্বয় জোরদারে বিশেষ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

গণতন্ত্র বিকাশ ও ধ্বংসের ৩৫ বছর

আপডেটের সময়: ০৮:২৪:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর আগেও ১৯৯১ সালে একবার দেশে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল। আর দেশে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। আসন্ন নির্বাচনের ডামাডোলে সবার আগ্রহ কেমন ছিল বিগত সময়ে দলীয় ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনগুলো, কোন নির্বাচন পেয়েছে গ্রহণযোগ্যতা, কোন নির্বাচন কী নামে খ্যাতি-কুখ্যাতি পেয়েছে। ১৯৯০ সালের ১৯ নভেম্বর একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে সই করেছিল বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনকারী রাজনৈতিক দলগুলো। চার দফা ওই ঘোষণায় ছিল, এরশাদের অধীনে সব নির্বাচন বয়কট ও প্রতিহত করা; এরশাদের পদত্যাগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর; অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর এবং গণমাধ্যমকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে।

তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এরপর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দেশে প্রথম কোনো অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় সংসদ নির্বাচন। এর আগে সংসদ নির্বাচন কিংবা গণভোট বা অন্য কোনো নির্বাচন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হয়নি। দেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, প্রথম এই অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন। ওই সরকারের প্রশাসন ছিল সবচেয়ে বেশি নিরপেক্ষ। কেমন ছিল দেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও পরবর্তী দুই নির্বাচন ১৯৯১ সালে সরকার গঠনের পর তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি পরবর্তী নির্বাচনগুলোর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনেনি। ফলে ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আবার সংকট তৈরি হয়।

আরও পড়ুনঃ  সাংবাদিক জাহেদ কায়সার এর কিশোর গল্প "স্টেশনের ছায়ামূর্তি " গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ফ্রিডম পার্টিকে নিয়ে একতরফা নির্বাচন করে বিএনপি। ওই নির্বাচনে বিএনপি ২৭৮টি আসনে জয়লাভ করে। বাকি আসনগুলোর একটি আসনে ফ্রিডম পার্টি, ১০টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হন, ১০টি আসনের ফলাফল অসমাপ্ত ছিল এবং একটি আসনের নির্বাচন আদালতের আদেশে স্থগিত হয়। তৎকালীন সরকারদল বিএনপির অধীনে হওয়া ওই নির্বাচন বয়কট করেছিল আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। আন্দোলনের মুখে ওই সংসদ টিকেছিল মাত্র ১১ দিন। নির্বাচন নিয়ে অবিশ্বাস, কারচুপির সমাধান হিসেবে দেশে প্রথমবারের মতো গঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন দেশে প্রথম কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ সংসদের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসনে জয়লাভ করে। অন্য দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ১১৬টি, জাতীয় পার্টি ৩২টি এবং জামায়াতে ইসলামী তিনটি আসনে জয়ী হয়।

এই নির্বাচনও দেশি ও আন্তর্জাতিক মহলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। পরে ২০০১ সালে এবং ২০০৮ সালে অষ্টম এবং নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে ১৯৩টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। অন্য দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ ৬২টি, জামায়াতে ইসলামী ১৭টি এবং জাতীয় পার্টি ও ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ১৪টি আসনে জয়ী হয়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এটি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ভোট। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। অন্য দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ৩০টি, জাতীয় পার্টি ২৭টি এবং জামায়াতে ইসলামী দুটি আসনে জয়ী হয়। এই তিনটি নির্বাচনে পরাজিতরা কারচুপির অভিযোগ আনলেও সবাই ভোটের ফলাফল মেনে নেয়। নির্বাচনগুলো সবার কাছে মোটামুটি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল।

আরও পড়ুনঃ  লাল মুক্তিবার্তা ও ভারতীয় তালিকা থেকে ৬৪৭৬ ‘ভুয়া’ মুক্তিযোদ্ধা বাদ

কেমন ছিল দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনগুলো ২০০৮-এর নির্বাচনে সরকার গঠনের পর ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬ সালে জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা আওয়ামী লীগ এর পেছনে যুক্তি হিসেবে আনে—এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অসাংবিধানিক। পরবর্তীকালে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দলীয় সরকারের অধীনে একতরফা নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ। এ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একাই ২৩৪টি আসন পায়, যার মধ্যে ১৫৩টি আসনে তারা জয়ী হয় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। দশম জাতীয় সংসদের এই নির্বাচন ‘বিনা ভোটের নির্বাচন’ নামে পরিচিত।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য করার আশ্বাস দিয়ে বিএনপিসহ বড় বড় দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানায় আওয়ামী লীগ। কিন্তু পরে বিবিসিসহ সংবাদমাধ্যমের খবরে দেখা যায়, নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরুর আগেই ব্যালটভর্তি বাক্স নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রে। অর্থাৎ রাতেই ব্যালট দিয়ে বাক্স ভরে রাখা হয়। ফলে ওই নির্বাচনটি ‘নিশিরাতের ভোট’ বলে পরিচিতি পায়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৫৮টি আসন পায়। জাতীয় পার্টি ২২টি এবং মহাজোটভুক্ত অন্য দলগুলো আটটি আসনে জয়ী হয়। অপরদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত বিএনপি ছয়টি, গণফোরাম দুটি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তিনটি আসনে জয়ী হন। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট বয়কট করেছিল (জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন ছিল না)।

আরও পড়ুনঃ  সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীর সংখ্যা ৬০০

২০১৪ সালের মতো ‘বিনা ভোটে’ আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা যেন জয়ী না হয়, সেই ‘বিব্রতকর’ পরিস্থিতি এড়াতে এবার অভিনব কৌশল নেয় আওয়ামী লীগ। ডামি প্রার্থী হিসেবে নিজ দলের নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করায় দলটি। ফলে এই নির্বাচনটি পরিচিত পায় ‘আমি-ডামি নির্বাচন’ নামে। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২২২টি আসন, জাতীয় পার্টি (জাপা) ১১টি আসন এবং জাসদ, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি একটি করে আসন জয়ী হয়। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন ৬২ জন, যাদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ নেতা। এই সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র সাত মাস। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় এবং দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এরপর থেকে দেশ পরিচালনা করছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারের অধীনে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফিরেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে কার্যকর আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করলেও বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে এর প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল। তারা আন্দোলন-সংগ্রামে বরাবরই ত্ত্ত্বাবধায়ক সরকার বহালের দাবি তুলে আসছিল। ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করে রায় ঘোষণা করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর মধ্য দিয়ে ২০১১ সালে আদালতের রায়ে বাতিল হওয়া সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার আবার ফিরে এসেছে। আগামী চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে কার্যকর হবে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার।