Dhaka ০৯:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ

মানুষ ইলিশ খায় নাকি ইলিশ মানুষ খায়

  • প্রতিবেদকের নাম
  • আপডেটের সময়: ০৬:৩৩:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৪০ সময় দেখুন

বরগুনা প্রতিনিধিঃ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কয়েক যুগ ধরে ইলিশ মাছ গতিপথ পরিবর্তন করছে। নদী ও সাগর দূষণ, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়া, সাগরে যত্রতত্র চর ও ডুবোচর সৃষ্টি এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে গতিপথ পরিবর্তন করেছে জাতীয় ও জনপ্রিয় মাছ ইলিশ। বরগুনার পায়রা, বলেশ্বর ও বিষখালী নদীতে এক সময়ে ইলিশের সমাহার ছিল‌। কিন্তু এখন এ সব নদী, নদীর মোহনা কিংবা সাগর মোহনাতেও ইলিশ ধরা পড়ছে না। জেলেরা বলছেন, দক্ষিণ-পূর্ব গভীর বঙ্গোপসাগরে এখনও কিছু ইলিশ পাওয়া যায়। তবে এই এলাকায় ঝড়-বৃষ্টি ও বৈরি আবহাওয়ায় ট্রলার ডুবি বেশি ঘটে। বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির তথ্য বলছে, চলতি মাসে দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকার করতে গিয়ে চারটি ট্রলার ডুবি গেছে। এর মধ্যে সর্বশেষ দুটি ট্রলার ডুবিতে এক জেলের মরদেহ উদ্ধার হলেও পাঁচজন নিখোঁজ রয়েছে। মৎস্যজীবীদের স্বার্থে সরাসরি কাজ করা এই সংগঠনের অফিসিয়াল নথি বলছে, বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকারে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে গত ৩৩ বছরে ১৯২ জনের বেশি জেলে নিখোঁজ হয়েছে।

 

 

পরে যাদের মরদেহ পাওয়া যায়নি। এছাড়া ভাসমান অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার হয়েছে কমপক্ষে সাড়ে চারশত জেলের। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দারিদ্র্যসহ নানা সংকট ও উৎকণ্ঠায় দিন পার করছে নিখোঁজ ও মৃত জেলেদের পরিবারের স্বজনেরা। বরগুনায় ছয় উপজেলার মধ্যে সব থেকে বেশি ইলিশ শিকার করে পাথরঘাটা উপজেলার জেলেরা। পাথরঘাটা উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকারে গিয়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ১৮৮ জন জেলে নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড়ে সাগরে নিখোঁজ হন ৯১ জন জেলে। ১৯৯৩ সালে পাঁচজন, ১৯৯৪ সালে দুইজন, ২০০১ সালে পাঁচজন, ২০০৬ সালে ১৪ জন, ২০১৪ সালে সাতজন, ২০১৮ সালে ১৩ জন এবং ২০২৩ সালে ১৫ জন জেলে নিখোঁজ হন। তবে, ট্রলার মালিক সমিতি বলছে, নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের দ্বিগুণ। বরগুনার তালতলী উপজেলার আল-আমীন ও গোলাম রাব্বির যৌথ মালিকানাধীন ট্রলারটি ১৩ জন জেলে নিয়ে গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে বঙ্গোপসাগরে যায়।

আরও পড়ুনঃ  জয়পুরহাটে ক্ষেতলালে প্রেমের বিয়ের এক বছর পর গৃহবধূর আত্মহত্যা

 

 

২১ সেপ্টেম্বর সাগর উত্তাল হয়ে উঠলে জেলেরা উপকূলে ফিরতে শুরু করেন। ২২ সেপ্টেম্বর সকালে কুয়াকাটা সংলগ্ন সাগর এলাকায় ঢেউয়ের তোড়ে ট্রলারটি উল্টে ডুবে যায়। অন্য একটি ট্রলার ১১ জেলেকে জীবিত উদ্ধার করে উপকূলে নিয়ে আসে। কিন্তু নিখোঁজ হয়েছে বড় ভাইজোড়া এলাকার জেলে মো. রাকিব এবং পাওয়াপাড়া এলাকার মো. নবী হোসেন। ট্রলারের মালিক ও মাঝি আল আমিন বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকারে গিয়ে বৈরি আবহাওয়ায় দুর্ঘটনায় পড়ে ট্রলার ডুবে যায়। এ সময় দুই জেলে রাকিব ও নবী হোসেন ট্রলারের কেবিনে থাকায় তারা বের হতে পারেনি। তিনি জানেন না, তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে? আল আমিন আরও বলেন, তারা দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে আগে ইলিশ শিকার করতেন। কিন্তু কয়েকবছর ধরে এই এলাকায় চর এবং ডুবোচরের কারণে ইলিশ পাওয়া যায় না। তাই তারা বাধ্য হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকারে যান। আর এই এলাকায় ট্রলার ডুবির ঘটনাও সব থেকে বেশি। ইলিশ শিকারে গিয়ে গত ২৪ আগস্ট বিকেলে বৈরি আবহাওয়ার কবলে পড়ে কুয়াকাটা থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব গভীর বঙ্গোপসাগরে ১৩ জেলেসহ এফবি বরকত নামে বরগুনার পাথরঘাটার একটি ট্রলার ডুবে যায়। এ ঘটনায় অন্য জেলেদের সহায়তায় আট জেলেকে উদ্ধার করা হলেও পাঁচ জেলে নিখোঁজ হন। তাদের মধ্যে সাইফুল মীরের মরদেহ উদ্ধার করা হলেও এক মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও চার জেলের লাশও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। সাইফুল মীরের বাবা সাহাদাত মীর (৬৫) বলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিল তার ছেলে।

আরও পড়ুনঃ  যাত্রাবাড়ীতে সাঁড়াশি অভিযান: যুবলীগ নেতাসহ ১৬ জনকে আটক করল পুলিশ

 

 

কিন্তু ইলিশ শিকারে গিয়ে নিহত হয়েছে। এখন তারা অর্ধাহার-অনাহারে দিন কাটান। একই ট্রলার ডুবিতে নিখোঁজ মো. বিল্লাল, মো. কাওসার, মো. নুর আলম ও মো. ইব্রাহিম। তাদের স্বজনরাও এখনও পথ চেয়ে বসে আছে। যদিও ট্রলার মালিক ও অন্যান্য জেলেরা বলছেন, সাগরে এতদিন ভেসে থাকা সম্ভব না। নিখোঁজ জেলে কাওসারের ছেলে সোহেল বলেন, সারা বছর ইলিশ পাওয়া যায় না। তাই ইলিশ মৌসুমে দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকার করতে যান তার বাবা। তারা জানতেন দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর উত্তাল ছিল। তারপরও ঝুঁকি নিয়ে ইলিশ শিকার করতে গিয়ে এখন তারা নিখোঁজ। লাশ পেলেও মনকে শান্ত্বনা দিতে পারতেন। কিন্তু এক মাস হয়ে গেছে। মনে হয় না, লাশ দেখতে পাবেন। তাছাড়া শুধু নিখোঁজ হলে সরকারি সহায়তা পাওয়া যাবে না, লাশ পেলে সহায়তা করবে সরকার। এফ বি স্বাধীন ট্রলারের মালিক হরিদাস বলেন, অন্যান্য মাছের দাম তুলনামূলক কম। তাই ওসব মাছে লাভ হয় অনেক কম। ইলিশের দাম তুলনামূলক বেশি, তাই তাদের লক্ষ্য থাকে ইলিশ শিকার। কিন্তু এই ইলিশ শিকারে বাধে জটিলতা। একদিকে যেমন জেলেরা নিখোঁজ হয়ে তাদের স্বজনরা পথে বসে যায়, তেমনি ট্রলার মালিকরাও ফকির হয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, একটি ট্রলার বানিয়ে সাগরে নামাতে দেড় থেকে দুই কোটি টাকা খরচ হয়। কিন্তু সাগরে বৈরি আবহাওয়ায় প্রায়ই ট্রলার ডুবি ঘটে। বেশিরভাগ ট্রলারের আর খোঁজ পাওয়া যায় না। জেলেদের পরিবার ট্রলার মালিকদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু তাদের সহায়তা করার সক্ষমতাও ট্রলার মালিকদের থাকে না।

আরও পড়ুনঃ  ভাদুরিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে নবীন বরণ ও ক্লাস উদ্বোধন অনুষ্ঠিত

 

 

ট্রলার ডুবিতে তারাও পথে বসে যায়। তিনি জানান, তার দুটি ট্রলারের একটি ট্রলার ডুবে গেছে ২০০৭ সালের সিডরে। সেই ঘাটতি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি।  বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘‘মানুষ ইলিশ খায়, নাকি ইলিশ মানুষ খায়— এটাই বুঝতে পারছি না। একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। জেলেরা নিখোঁজ হচ্ছে, কারও লাশ পাওয়া যায়, আবার অনেকের লাশ পর্যন্ত পাওয়া যায় না।’ আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, জেলেদের জীবনের মূল্য নেই। এত এত জেলেরা ইলিশ শিকারে গিয়ে নিখোঁজ হয়, অথচ তাদের উদ্ধারে সরকারের পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। তারা বিভিন্ন সময় আন্দোলন করেছেন জেলেদের উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলকে কাজে লাগানোর। তবে বার বার শুধু আশ্বাস পেয়েছেন, বাস্তবায়ন হয়নি। এ বিষয়ে বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বলেন, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে সাগরে চর ও ডুবোচরে বেশিরভাগ সময়ে ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে। আবার বিভিন্ন সময়ে হঠাৎ ঝড় হয় সাগরে। যা উপকূলে বসে কেউ টের পায় না। তারা চেষ্টা করছেন, জেলেদের নিয়ে একটি সঠিক পরিকল্পনার। সাগরে মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন এবং জেলেদের ভাগ্য উন্নয়নে নানামুখী পরিকল্পনাও করা হয়েছে। বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ বলেন, উপকূলীয় জেলা বরগুনার জেলেদের সমস্যার বিষয়ে লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবেন। বরগুনায় আবহাওয়া অফিস নির্মাণের উদ্যোগের পাশাপাশি নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে সরকারের তৎপরতা বাড়ানো এবং ট্রলারে জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক করতেও উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ

মানুষ ইলিশ খায় নাকি ইলিশ মানুষ খায়

আপডেটের সময়: ০৬:৩৩:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বরগুনা প্রতিনিধিঃ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কয়েক যুগ ধরে ইলিশ মাছ গতিপথ পরিবর্তন করছে। নদী ও সাগর দূষণ, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়া, সাগরে যত্রতত্র চর ও ডুবোচর সৃষ্টি এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে গতিপথ পরিবর্তন করেছে জাতীয় ও জনপ্রিয় মাছ ইলিশ। বরগুনার পায়রা, বলেশ্বর ও বিষখালী নদীতে এক সময়ে ইলিশের সমাহার ছিল‌। কিন্তু এখন এ সব নদী, নদীর মোহনা কিংবা সাগর মোহনাতেও ইলিশ ধরা পড়ছে না। জেলেরা বলছেন, দক্ষিণ-পূর্ব গভীর বঙ্গোপসাগরে এখনও কিছু ইলিশ পাওয়া যায়। তবে এই এলাকায় ঝড়-বৃষ্টি ও বৈরি আবহাওয়ায় ট্রলার ডুবি বেশি ঘটে। বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির তথ্য বলছে, চলতি মাসে দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকার করতে গিয়ে চারটি ট্রলার ডুবি গেছে। এর মধ্যে সর্বশেষ দুটি ট্রলার ডুবিতে এক জেলের মরদেহ উদ্ধার হলেও পাঁচজন নিখোঁজ রয়েছে। মৎস্যজীবীদের স্বার্থে সরাসরি কাজ করা এই সংগঠনের অফিসিয়াল নথি বলছে, বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকারে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে গত ৩৩ বছরে ১৯২ জনের বেশি জেলে নিখোঁজ হয়েছে।

 

 

পরে যাদের মরদেহ পাওয়া যায়নি। এছাড়া ভাসমান অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার হয়েছে কমপক্ষে সাড়ে চারশত জেলের। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দারিদ্র্যসহ নানা সংকট ও উৎকণ্ঠায় দিন পার করছে নিখোঁজ ও মৃত জেলেদের পরিবারের স্বজনেরা। বরগুনায় ছয় উপজেলার মধ্যে সব থেকে বেশি ইলিশ শিকার করে পাথরঘাটা উপজেলার জেলেরা। পাথরঘাটা উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকারে গিয়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ১৮৮ জন জেলে নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড়ে সাগরে নিখোঁজ হন ৯১ জন জেলে। ১৯৯৩ সালে পাঁচজন, ১৯৯৪ সালে দুইজন, ২০০১ সালে পাঁচজন, ২০০৬ সালে ১৪ জন, ২০১৪ সালে সাতজন, ২০১৮ সালে ১৩ জন এবং ২০২৩ সালে ১৫ জন জেলে নিখোঁজ হন। তবে, ট্রলার মালিক সমিতি বলছে, নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের দ্বিগুণ। বরগুনার তালতলী উপজেলার আল-আমীন ও গোলাম রাব্বির যৌথ মালিকানাধীন ট্রলারটি ১৩ জন জেলে নিয়ে গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে বঙ্গোপসাগরে যায়।

আরও পড়ুনঃ  মেঘের রাজ্যে পর্যটনের সম্ভাবনার মাঝেও শঙ্কা

 

 

২১ সেপ্টেম্বর সাগর উত্তাল হয়ে উঠলে জেলেরা উপকূলে ফিরতে শুরু করেন। ২২ সেপ্টেম্বর সকালে কুয়াকাটা সংলগ্ন সাগর এলাকায় ঢেউয়ের তোড়ে ট্রলারটি উল্টে ডুবে যায়। অন্য একটি ট্রলার ১১ জেলেকে জীবিত উদ্ধার করে উপকূলে নিয়ে আসে। কিন্তু নিখোঁজ হয়েছে বড় ভাইজোড়া এলাকার জেলে মো. রাকিব এবং পাওয়াপাড়া এলাকার মো. নবী হোসেন। ট্রলারের মালিক ও মাঝি আল আমিন বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকারে গিয়ে বৈরি আবহাওয়ায় দুর্ঘটনায় পড়ে ট্রলার ডুবে যায়। এ সময় দুই জেলে রাকিব ও নবী হোসেন ট্রলারের কেবিনে থাকায় তারা বের হতে পারেনি। তিনি জানেন না, তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে? আল আমিন আরও বলেন, তারা দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে আগে ইলিশ শিকার করতেন। কিন্তু কয়েকবছর ধরে এই এলাকায় চর এবং ডুবোচরের কারণে ইলিশ পাওয়া যায় না। তাই তারা বাধ্য হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকারে যান। আর এই এলাকায় ট্রলার ডুবির ঘটনাও সব থেকে বেশি। ইলিশ শিকারে গিয়ে গত ২৪ আগস্ট বিকেলে বৈরি আবহাওয়ার কবলে পড়ে কুয়াকাটা থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব গভীর বঙ্গোপসাগরে ১৩ জেলেসহ এফবি বরকত নামে বরগুনার পাথরঘাটার একটি ট্রলার ডুবে যায়। এ ঘটনায় অন্য জেলেদের সহায়তায় আট জেলেকে উদ্ধার করা হলেও পাঁচ জেলে নিখোঁজ হন। তাদের মধ্যে সাইফুল মীরের মরদেহ উদ্ধার করা হলেও এক মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও চার জেলের লাশও এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। সাইফুল মীরের বাবা সাহাদাত মীর (৬৫) বলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিল তার ছেলে।

আরও পড়ুনঃ  দেশব্যাপী ষড়যন্ত্র ও নৈরাজ্যের প্রতিবাদে সিরাজগঞ্জে বিএনপির সমাবেশ

 

 

কিন্তু ইলিশ শিকারে গিয়ে নিহত হয়েছে। এখন তারা অর্ধাহার-অনাহারে দিন কাটান। একই ট্রলার ডুবিতে নিখোঁজ মো. বিল্লাল, মো. কাওসার, মো. নুর আলম ও মো. ইব্রাহিম। তাদের স্বজনরাও এখনও পথ চেয়ে বসে আছে। যদিও ট্রলার মালিক ও অন্যান্য জেলেরা বলছেন, সাগরে এতদিন ভেসে থাকা সম্ভব না। নিখোঁজ জেলে কাওসারের ছেলে সোহেল বলেন, সারা বছর ইলিশ পাওয়া যায় না। তাই ইলিশ মৌসুমে দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকার করতে যান তার বাবা। তারা জানতেন দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর উত্তাল ছিল। তারপরও ঝুঁকি নিয়ে ইলিশ শিকার করতে গিয়ে এখন তারা নিখোঁজ। লাশ পেলেও মনকে শান্ত্বনা দিতে পারতেন। কিন্তু এক মাস হয়ে গেছে। মনে হয় না, লাশ দেখতে পাবেন। তাছাড়া শুধু নিখোঁজ হলে সরকারি সহায়তা পাওয়া যাবে না, লাশ পেলে সহায়তা করবে সরকার। এফ বি স্বাধীন ট্রলারের মালিক হরিদাস বলেন, অন্যান্য মাছের দাম তুলনামূলক কম। তাই ওসব মাছে লাভ হয় অনেক কম। ইলিশের দাম তুলনামূলক বেশি, তাই তাদের লক্ষ্য থাকে ইলিশ শিকার। কিন্তু এই ইলিশ শিকারে বাধে জটিলতা। একদিকে যেমন জেলেরা নিখোঁজ হয়ে তাদের স্বজনরা পথে বসে যায়, তেমনি ট্রলার মালিকরাও ফকির হয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, একটি ট্রলার বানিয়ে সাগরে নামাতে দেড় থেকে দুই কোটি টাকা খরচ হয়। কিন্তু সাগরে বৈরি আবহাওয়ায় প্রায়ই ট্রলার ডুবি ঘটে। বেশিরভাগ ট্রলারের আর খোঁজ পাওয়া যায় না। জেলেদের পরিবার ট্রলার মালিকদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু তাদের সহায়তা করার সক্ষমতাও ট্রলার মালিকদের থাকে না।

আরও পড়ুনঃ  জয়পুরহাটে ক্ষেতলালে প্রেমের বিয়ের এক বছর পর গৃহবধূর আত্মহত্যা

 

 

ট্রলার ডুবিতে তারাও পথে বসে যায়। তিনি জানান, তার দুটি ট্রলারের একটি ট্রলার ডুবে গেছে ২০০৭ সালের সিডরে। সেই ঘাটতি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি।  বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘‘মানুষ ইলিশ খায়, নাকি ইলিশ মানুষ খায়— এটাই বুঝতে পারছি না। একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। জেলেরা নিখোঁজ হচ্ছে, কারও লাশ পাওয়া যায়, আবার অনেকের লাশ পর্যন্ত পাওয়া যায় না।’ আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, জেলেদের জীবনের মূল্য নেই। এত এত জেলেরা ইলিশ শিকারে গিয়ে নিখোঁজ হয়, অথচ তাদের উদ্ধারে সরকারের পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। তারা বিভিন্ন সময় আন্দোলন করেছেন জেলেদের উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলকে কাজে লাগানোর। তবে বার বার শুধু আশ্বাস পেয়েছেন, বাস্তবায়ন হয়নি। এ বিষয়ে বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বলেন, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে সাগরে চর ও ডুবোচরে বেশিরভাগ সময়ে ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে। আবার বিভিন্ন সময়ে হঠাৎ ঝড় হয় সাগরে। যা উপকূলে বসে কেউ টের পায় না। তারা চেষ্টা করছেন, জেলেদের নিয়ে একটি সঠিক পরিকল্পনার। সাগরে মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন এবং জেলেদের ভাগ্য উন্নয়নে নানামুখী পরিকল্পনাও করা হয়েছে। বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ বলেন, উপকূলীয় জেলা বরগুনার জেলেদের সমস্যার বিষয়ে লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবেন। বরগুনায় আবহাওয়া অফিস নির্মাণের উদ্যোগের পাশাপাশি নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে সরকারের তৎপরতা বাড়ানো এবং ট্রলারে জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক করতেও উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।