
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ গত সপ্তাহে ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১০ হাজারেরও বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা সত্ত্বেও দেশটির তরুণ বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড টপকে সরকারবিরোধী সেøাগান দেন এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। পুলিশ সদস্যরা এক তরুণকে জোর করে বাসে তোলার আগে তিনি চিৎকার করে বলেন, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’।ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীলতা এবং বিরোধীদের প্রতি নতুন করে বাড়তে থাকা সমর্থন ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর মোদির জন্য সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করেছে, যেখানে ভারতের ১শ’ কোটি ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশই ৩০ বছরের কম বয়সী তথা জেন জি। শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নেয়া দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী অনন্যা রাতুরি বলেন, ‘আমাদের ভেতর থেকে ভয় চলে গেছে। পুলিশ আমাদের আটক করবে বা মারধর করবে, এতে আমরা আর ভয় পাই না। এ প্রজন্ম বরং এসব বিষয়কে উপভোগই করছে’।স্বাধীন সংস্থা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্ট’ জানিয়েছে, মোদির উগ্র হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়তে থাকায় এ বছর ভারতে রাস্তায় বিক্ষোভের সংখ্যা গত এক দশকের যেকোনো বছরের তুলনায় ছাড়িয়ে যেতে পারে।
দিল্লি ও অন্যান্য স্থানে বিক্ষোভকারীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন বিজেপিকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন আন্দোলনকারী ও বিরোধী দলগুলো।এছাড়া বেকারত্ব, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধ এবং মোদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা ধনকুবের ব্যবসায়ীদের নিয়েও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। আন্দোলনকর্মী যোগেন্দ্র যাদব বলেন, ‘জাতি হঠাৎ করেই নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পেয়েছে। আমি বলব না যে এটি মোদি সরকারের পতনের সূচনা, তবে এটি নিঃসন্দেহে অধোগতির ধারাবাহিকতার শুরু’।এ আন্দোলনটি জাতীয় পর্যায়ে মনোযোগ আকর্ষণ করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-এর মাধ্যমে। ভারতের প্রধান বিচারপতি দেশের বেকার মানুষদেরকে ‘তেলাপোকা’র সাথে তুলনা করার পর, অনলাইনে শুরু হওয়া একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা থেকে এটি জুন মাসে দেশব্যাপী একটি আন্দোলনে রূপ নেয়। মুঠোফোনে ধারণ করা ভিডিও এবং স্বাধীন সংবাদভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেলগুলো বিক্ষোভের প্রচার বাড়িয়েছে। এর ফলে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং বামপন্থী আন্দোলনকর্মী নেহা বোরাও ইন্টারনেটে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এবং তার কয়েক হাজার সমর্থকও বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। তরুণ বিক্ষোভকারীরা মোদির উগ্র হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদী সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে, সরকার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কর্মসংস্থান ও সুযোগ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর পরিবর্তে তারা ধর্মীয় বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিচ্ছে এবং সংখ্যালঘু—বিশেষ করে মুসলিমদেরকে লক্ষ্য করে বিভাজনমূলক রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কলকাতার ৩০ বছর বয়সী চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী গৌরী শেঠ বলেন, ‘সরকার অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো তারা ধর্মীয় অবকাঠামোর মতো বিষয়গুলোতে মনোযোগ দিচ্ছে। সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। কেউ যদি তাদের বিরুদ্ধে কথা বলে, তবে তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী বা দেশদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়’। আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্টেট অফ ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ভারতে ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৪০ শতাংশ।
অন্যদিকে, ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী স্নাতকদের প্রতি ৫ জনের মধ্যে একজন বেকার। মে মাসে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনায় জাতীয় মেডিক্যাল কলেজগুলোর পরীক্ষা বাতিল করে সরকার, যার ফলে ব্যাপক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। দিল্লির ৩০ বছর বয়সী সমাজকর্মী রুবি সিং বলেন, ‘এ প্রজন্ম সঠিক শিক্ষা না পাওয়ার চরম মাশুল দিচ্ছে, যার ফলে তারা ভালো কোনো সুযোগ পাওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছে না’। ভারতের এ অস্থিতিশীলতাকে বাংলাদেশ ও নেপালের সেই যুব-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে, যা সরকার পতনের কারণ হয়েছিল। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন যে, ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং মোদির জনপ্রিয়তার কারণে এ তুলনা পুরোপুরি যথার্থ নয়। দেশটির সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে আগামী বছরের শুরুর দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা মোদির বর্তমান জনসমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠবে। সূত্র : রয়টার্স।
প্রতিবেদকের নাম 























