
মোঃ মনিরুজ্জামান ব্যুরো চিফ, রংপুর বিভাগ: তিস্তা কেবল একটি নদী নয়; উত্তরের জনপদে এটি এক জীবন্ত হাহাকার আর কোটি মানুষের টিকে থাকার সংগ্রাম। বছরের পর বছর খরা, ভাঙন আর অকাল বন্যায় নিঃস্ব হওয়া তিস্তাপারের মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান কি এবার হতে যাচ্ছে? বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’বাস্তবায়নের বিষয়টি আবারও নতুন করে প্রাণ পেয়েছে। আগামী জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য চীন সফরকে ঘিরে এখন নতুন স্বপ্নে বিভোর উত্তরাঞ্চল।ভূ-রাজনীতি ও মহাপরিকল্পনার প্রেক্ষাপট ২০১৬ সাল থেকে চীনের ‘পাওয়ার চায়না কনস্ট্রাকশন’ তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করলেও ভারতের আপত্তির মুখে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রকল্পটি থমকে দেয়। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা সরকার এটি ভারতের মাধ্যমে বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলে স্থবিরতা আরও বাড়ে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দৃশ্যপট বদলে যায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চীনের সাথে যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করে এবং নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার গঠনের পর সেই ধারাবাহিকতা আরও গতিশীল হয়েছে। সম্প্রতি চীনা রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানিয়েছেন, বেইজিং এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে পুরোপুরি প্রস্তুত।
বিশেষজ্ঞদের মত
পরনির্ভরশীলতা না কি নিজস্ব উদ্যোগ? নদী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদেশি অর্থায়নের জন্য অনন্তকাল অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। রিভারাইন পিপলের পরিচালক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, “তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে লক্ষ কোটি টাকার প্রয়োজন নেই। সরকার চাইলে বার্ষিক বাজেটে সামান্য বরাদ্দ রেখে নিজস্ব অর্থায়নেই কয়েক বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে পারে।” তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘদিনের ‘নতজানু’ পররাষ্ট্রনীতির কারণে তিস্তা চুক্তি ঝুলে আছে। ভারত যদি মহাপরিকল্পনাতেও বাধা দেয়, তবে বাংলাদেশের উচিত হবে আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হওয়া।
আশার আলো ও জনগণের দাবি
তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের নেতারা মনে করছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফর এবং আসন্ন প্রধানমন্ত্রীর সফর হতে পারে এই প্রকল্পের টার্নিং পয়েন্ট। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান বলেন, “নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী আমরা এখন দৃশ্যমান কাজ দেখতে চাই।তিস্তাপারের মানুষ আর আশ্বাস নয়, খননযন্ত্রের শব্দ শুনতে চায়।” বাস্তবতা ও সংকট শুকনো মৌসুমে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহার আর বর্ষায় হঠাৎ পানি ছেড়ে দেওয়ার ফলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি এই অঞ্চলের মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
এখন দেখার বিষয়, জুনের উচ্চপর্যায়ের চীন সফর থেকে কোটি মানুষের এই আজন্ম লালিত স্বপ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় কি না। উত্তরের কোটি চোখ এখন বেইজিং আর ঢাকার কূটনৈতিক টেবিলের দিকে।
প্রতিবেদকের নাম 



















