
মো: মনিরুজ্জামান ব্যুরো চিফ, রংপুর: তিস্তায় বন্যার পানি টান ধরলেও বেড়েছে দুর্ভোগ। নদীপাড়ের পাঁচ জেলায় অন্তত ৮ হাজার পরিবার পানিবন্দি। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে চরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্ক কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ফের পানি বাড়বে- এমন শঙ্কায় উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন তিস্তাপাড়ের মানুষ। তিস্তা নদীর পানি রবিবার সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে বিপৎসীমার (৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার) ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। রাত ১১টায় ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলে নদীপাড়ের পাঁচ জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা দেখা দেয়। এদিকে, হঠাৎ করে তিস্তা নদীর পানিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় রংপুরের গঙ্গাচড়ার তিস্তা সেতু রক্ষাবাঁধ ও ডানতীর রক্ষায় নির্মিত গ্রোয়েন এলাকায় ভাঙনসহ কোলকোন্দ এবং লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। বেশকিছু পরিবার পানিবন্দিসহ চরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন। তলিয়ে গেছে পাট, বাদাম ও আমনের বীজতলা। কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। একই অবস্থা বিরাজ করছে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী, দোয়ানী, সানিয়াজান, নিজ শেখসুন্দর, বাঘের চর, সিঙ্গীমারি, ধুবনী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ি, কালীগঞ্জের শৈলমারী, চর বৈরাতী, রুদ্রেশ্বর, আদিতমারীর মহিষখোচা, গোবর্ধনসহ কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারীর নিম্নাঞ্চলেও। গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী জানান, তার ইউনিয়নে পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যার পানি নেমে গেলেও দুর্ভোগ বেড়েছে তিস্তাপাড়ের মানুষের। পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, রবিবার সকাল থেকে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। উত্তরাঞ্চলে বন্যার ভয়: তিস্তা অববাহিকার পাঁচ জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড রংপুরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানিয়েছেন, পানিবন্দি হয়ে পড়েছে উত্তরের পাঁচ জেলার চরাঞ্চলের অন্তত আট হাজার পরিবার। ভারত গজলডোবা ব্যারাজের ৪০টি গেট খুলে দেওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তবে সোমবার রাত ১১টা পর্যন্ত বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও পরে তা কমতে শুরু করে। পাঁচ জেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে ভাঙন। গত ২৪ ঘণ্টায় এসব এলাকার ২৬ পরিবারের ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। তিস্তায় পানি কমলেও দুর্ভোগ কমেনি: তিস্তা নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে পানি কমতে শুরু করলেও রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি পানির নিচে রয়েছে। এর আগে রবিবার সন্ধ্যা ৬টায় তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৭সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পরে রাত ৯টায় তা বেড়ে ১১ সেন্টিমিটার ওপরে অবস্থান করে। এতে নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয় এবং টানা বৃষ্টির কারণে চরাঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ভোগান্তি সৃষ্টি হয়। পরে রাতভর পানি কমে গতকাল ভোর ৬টায় তা বিপৎসীমার সমানে নেমে আসে এবং সকাল ৯টার পর থেকে পরিস্থিতি আরও কিছুটা উন্নত হলেও এখনো নিম্নাঞ্চলের পানি নামতে শুরু করেনি। আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্ধন এলাকার রফিকুল ইসলাম (৬২) জানান, হঠাৎ করে ঘরের ভেতর হাঁটু সমান পানি উঠেছে। কোনোরকমে চৌকির ওপর বসে রাত পার করেছেন। তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি কমলেও ভাটি এলাকা থেকে পানি সরে যায়নি। ভুরুঙ্গামারীতে পানিবন্দি ৩ হাজার মানুষ: তিন দিনের টানা ভারী বৃষ্টিপাত আর ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার প্রধান নদী দুধকুমারের পানি বিপৎসীমার ২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নদের দুকূল উপচে নদী অববাহিকার চর ও ডুবোচরে পানি ঢুকে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়েছে প্রায় তিন হাজার মানুষ। রাস্তাঘাট তলিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কুড়িগ্রাম পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়,
গতকাল বিকাল ৩টায় দুধকুমার নদের পানি পাটেশ্বরী পয়েন্টে ২৯.৮৪ সেন্টিমিটার রেকর্ড করা হয়েছে। এ নদীর পানির বিপৎসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৯.৬০ সেন্টিমিটার। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, কুড়িগ্রামের নদনদীর পানি আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদে বন্যা দেখা দিতে পারে। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, শুকনো খাবার ও মেডিকেল টিম প্রস্তুত রয়েছে। পানি বৃদ্ধির ফলে এসব নদীর তীরবর্তী নিচু অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। চরাঞ্চলে পানি ওঠার ফলে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন এসব চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। পানিতে তলিয়ে গেছে এসব চরের শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ দুধকুমার নদীর অববাহিকার দক্ষিণ তিলাই ও দক্ষিণছাট গোপালপুর গ্রামের চার শতাধিক বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে। পাইকেরছড়া ইউনিয়নের ছিটপাইকের ছড়া ও পাইকডাঙ্গা, সোনাহাট ইউনিয়নের চর বলদিয়া, চর শতিপুরি, চর ভুরুঙ্গামারী ইউনিয়নের ইসলামপুর ও আন্ধারিঝাড় ইউনিয়নের চর বাড়ুইটারী, চর ধাউরারখুঁটিসহ বেশকিছু চরাঞ্চল প্লাবিত। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেবনাথ দৈনিক আজকের জনবানীকে জানালেন, বন্যা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখতে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। শুকনো খাবার ও মেডিকেল ডিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদকের নাম 








