
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ডেঙ্গুর প্রকোপের মধ্যে চিকিৎসা নিতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে আসছেন বিভিন্ন এলাকার রোগীরা। তবে হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি, ময়লা-আবর্জনা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ মশার বংশবিস্তার এবং রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এমনকি হাসপাতালের একটি ভবনের তৃতীয় তলায় ওয়াশরুমের বড় পাইপে ছিদ্র দিয়ে টয়লেটের ময়লা বের হয়ে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে দুর্গন্ধের পাশাপাশি ওই পথে চলাচলকারীদের পায়ের সঙ্গে ময়লা ছড়িয়ে পড়ছে। সরেজমিনে দেখা যায় আজ রবিবার (১৮ অক্টোবর), হাসপাতালের বহির্বিভাগ দিয়ে প্রবেশের পর বিভিন্ন খোলা ড্রেন ও গর্তে পানি জমে আছে। কোথাও ডাবের খোসায়, কোথাও চায়ের কাপে জমে আছে পানি। শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) থেকে ঝরে পড়া পানিও জমে থাকতে দেখা যায়। এসব পানিতে সিগারেটের অবশিষ্টাংশ, টিস্যু পেপারসহ বিভিন্ন ধরনের ময়লা ভাসছে। কোথাও স্বচ্ছ পানি, কোথাও ময়লা পানি জমে আছে। এসব পানিতে মশার উপস্থিতিও চোখে পড়ে।
এর পাশেই চিকিৎসার সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করছেন অসংখ্য রোগী। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের পাশেও পানি জমে আছে। সেখান থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, দেখা গেছে মশার উপস্থিতিও। এ ছাড়া ইনডোর বিভাগ থেকে বের হয়ে বাম পাশেও পানি জমে থাকতে দেখা যায়। সেই পানির ওপর মশা ভাসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপযুক্ত পরিবেশে জমে থাকা পানিতে মাত্র তিন দিনেই এডিস মশার লার্ভা তৈরি হতে পারে। তাই ডেঙ্গুর প্রকোপের সময় হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি অপসারণ ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ‘হাসপাতালে এডিস মশার প্রজনন হলে ঝুঁকি আরও বেশি, কারণ সেখানে অনেক রোগীর চিকিৎসা হয়। এতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বেশি থাকে। এ জন্য প্রতিটি হাসপাতালের কম্পাউন্ডে সপ্তাহে অন্তত এক দিন ঘুরে দেখতে হবে, কোথাও পানি জমে আছে কি না বা কোনো পাত্রে পানি জমে আছে কি না। এসব স্থান নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। কোনোভাবেই হাসপাতালের আশপাশে এডিস মশার প্রজনন হতে দেওয়া উচিত নয়।
এ জন্য হাসপাতালের আশপাশ পরিষ্কার রাখা জরুরি। তিনি আরও বলেন, এডিস মশা স্বচ্ছ ও অপরিষ্কার; দুই ধরনের পানিতেই প্রজনন করতে পারে। তবে পানি কোথাও জমে থাকতে হবে। চলমান পানিতে এডিস মশার লার্ভা জন্মায় না। জমে থাকা পানিতে তিন দিনে এডিস মশার লার্ভা তৈরি হতে পারে। তবে ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশা হতে প্রায় সাত দিন সময় লাগে। এডিস মশা পাত্রের গায়ে বসে পানির কিনারায় ডিম পাড়ে। অন্যদিকে, কিউলেক্স মশা পানির ওপর ডিম পাড়ে। তাই হাসপাতালের কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি। সুস্থ হতে এসে অসুস্থ হওয়ার শঙ্কা: নিজের ছেলেকে চিকিৎসা করাতে ঢাকা মেডিক্যালে এসেছেন মোছাম্মৎ আছিয়া। তার ছেলের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। আছিয়া বলেন, ‘আমরা চিকিৎসা নিতে আসি সুস্থ হওয়ার আশায়। অথচ এখানে বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকলে এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ থাকলে সুস্থ হওয়ার বদলে আরও অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কেউ হয়তো অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে এসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন। হাসপাতালের ভেতরে এমন অবস্থা থাকলে সুস্থ হওয়া কীভাবে সম্ভব? বিষয়গুলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরে আনা উচিত।
হাসপাতালের তৃতীয় তলার একটি অংশে গিয়ে দেখা যায়, বাম পাশের ওয়াশরুমের বড় পাইপে ছিদ্র থাকায় সেখান দিয়ে টয়লেটের ময়লা বের হচ্ছে। এতে আশপাশে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। ওই পথে চলাচলকারীদের পায়ের সঙ্গে ময়লা আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে। হাসপাতালে ভর্তি থাকা স্ত্রীর সঙ্গে অবস্থান করছেন মোহাম্মদ আরিফ। তিনি বলেন, গত দুই দিন ধরে ওই পাইপ দিয়ে টয়লেটের ময়লা বের হচ্ছে। বাধ্য হয়ে তাদের সেই ময়লার ওপর দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘প্রথম দিনই পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখান থেকে কত ধরনের জীবাণু ছড়াতে পারে, কত মানুষ অসুস্থ হতে পারেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। হাসপাতালে এসেছি সুস্থ হওয়ার জন্য, অথচ এখানেই জীবাণু ও দুর্গন্ধের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। হাসপাতালের আরেকটি অংশ দেখিয়ে আরিফ বলেন, সেখানেও দীর্ঘদিন ধরে ময়লা পানি জমে আছে। এত বড় হাসপাতালে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন। তাই হাসপাতালের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা জরুরি।
যা বলছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ: ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, হাসপাতালের ধারণক্ষমতার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। রোগীদের সঙ্গে তাদের স্বজনেরাও হাসপাতালে অবস্থান করেন। ফলে অতিরিক্ত মানুষের চাপের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘তবে আমরা পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি। আমি নিজেও নতুন যোগ দিয়েছি। যতটুকু সম্ভব, আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’ টয়লেটের পাইপের ছিদ্র দিয়ে ময়লা বের হওয়ার বিষয়ে পরিচালক বলেন, সমস্যাটি দ্রুত সমাধান করা হবে। এ ছাড়া হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে থাকা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।
প্রতিবেদকের নাম 























