
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বাচ্চাদের ভাত খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। আমার আসতে একটু দেরি হবে, একটা নিউজ নিয়ে ব্যস্ত আছি।’ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় স্ত্রী আনন্দিতা সাংমাকে ফোনে এ কথাই বলেছিলেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির (৪৪)। তখন তার কোলে ছিল দেড় বছরের ছেলে আইয়ান সাফয়ান। স্ত্রী জানতেন না, স্বামীর সঙ্গে সেটিই হবে তার শেষ কথা। রাতে দুই সন্তানকে খাইয়ে স্বামীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন আনন্দিতা। কিছুক্ষণ পর গুলির শব্দ শুনে প্রথমে ভেবেছিলেন, কেউ হয়তো পটকা ফুটিয়েছে। পরে জানতে পারেন, গুলি করা হয়েছে তার স্বামীকে। ছুটে গিয়ে দেখেন, রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন লুৎফুজ্জামান। বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ির পাশের একটি চায়ের দোকানের সামনে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, দুই যুবক খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে পরপর গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ ঘটনাটিকে প্রাথমিকভাবে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করছে। তবে কেন তাকে হত্যা করা হলো, কারা এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত কিংবা আগের হামলার সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে জখম করা হয়েছিল এই সাংবাদিককে। এক বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে ফের হামলার শিকার হয়ে এবার প্রাণ হারালেন তিনি।
আগে হামলা, এবার গুলি করে হত্যা
লুৎফুজ্জামানের ওপর আগেও হামলা হয়েছিল। গত বছরের ১০ নভেম্বর দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা তাকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে জখম করে। সে সময় তার সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়। সেই ঘটনার পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, হামলার পেছনে কারা ছিল এবং ওই ঘটনার তদন্তের অগ্রগতি কী—এসব তথ্য জানা জরুরি। কারণ, আগের হামলার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে একই সাংবাদিককে গুলি করে হত্যার ঘটনা নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে আগের হামলার সঙ্গে বৃহস্পতিবারের হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। হত্যার আগে কী লিখেছিলেন তিনি? লুৎফুজ্জামান আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে স্থানীয় বিভিন্ন অনিয়ম, অপরাধ ও ঘটনার বিষয়ে লেখালেখির পাশাপাশি ভিডিও প্রকাশ করতেন তিনি।
হত্যাকাণ্ডের মাত্র দুই ঘণ্টা আগেও ওই পেজে একটি স্ট্যাটাস দেন লুৎফুজ্জামান। সেখানে স্থানীয় মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত ইলিয়াস কাদের বাবুলকে নিয়ে তিনি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। লুৎফুজ্জামান মাদক ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তার প্রকাশিত প্রতিবেদন বা ভিডিও নিয়ে কারও সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়েছিল কি না, কেউ তাকে হুমকি দিয়েছিল কি না কিংবা মাদক ও চোরাচালানবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক আছে কি না—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। তবে পুলিশ এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য বা জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানায়নি। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে তেলনজিয়া গ্রামে শ্বশুরবাড়ির পাশের একটি চায়ের দোকানে বসে চা পান করেন লুৎফুজ্জামান। পরে বিরিশিরি-উতরাইল বাজারের দিকে যাওয়ার জন্য দোকান থেকে বের হন। কিছুদূর যাওয়ার পর বুঝতে পারেন, মুঠোফোনটি দোকানে ফেলে এসেছেন। প্রায় তিন মিনিট পর আবার দোকানে ফিরে আসেন তিনি। চায়ের দোকানি রবিন রাংসা বলেন, লুৎফুজ্জামান চা পান শেষে মুঠোফোন নিতে ফিরে আসেন। ফোন নিয়ে দোকান থেকে বের হওয়ার সময় দুই যুবক সেখানে আসে। তারা প্রথমে তার কাছে সিগারেট চায়। এরপরই লুৎফুজ্জামানকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।
রবিন রাংসা বলেন, ‘আমি তখন চায়ের কাপ ধুচ্ছিলাম। লুৎফুজ্জামান চা খেয়ে যাওয়ার সময় মুঠোফোন ফেলে যাওয়ায় আবার ফিরে আসেন। তিনি ফোন নিয়ে বের হওয়ার সময় দুই যুবক এসে আমার কাছে সিগারেট চায়। এরপর লুৎফুজ্জামানকে গুলি করে। আমি পরপর চারটি গুলির শব্দ শুনেছি। ভয়ে দোকানের ভেতর গিয়ে ঢুকে পড়ি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই যুবকের বয়স আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ বছর। একজনের পরনে ছিল লুঙ্গি, অন্যজনের থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট। খুব কাছ থেকে গুলি করার পর স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে তারা দৌড়ে পালিয়ে যায়। পরে লুৎফুজ্জামানকে উদ্ধার করে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের রাস্তার পাশে একটি বাড়ির বারান্দায় চায়ের দোকানটি। দোকান থেকে লুৎফুজ্জামানের শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব প্রায় ৫০ গজ। মাঝখানে রয়েছে মাত্র চারটি ঘর।
ঘটনার পর পুরো এলাকায় নেমে আসে নীরবতা। শ্বশুরবাড়িতে স্বজনদের আহাজারি। তেলনজিয়া গ্রামের অধিকাংশ বাসিন্দাই গারো সম্প্রদায়ের। লুৎফুজ্জামানের ফুফুশাশুড়ি নিরালা রেমা ও রুলি রেমা বলেন, তারা বাড়ির বারান্দায় বসে গল্প করছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে দোকানের কাছে গিয়ে লুৎফুজ্জামানকে নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তার মাথা, গলা ও বুক থেকে রক্ত ঝরছিল। তারা বলেন, ‘ছেলেটা খুব ভালো ছিল। আমাদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকত। আমাদের খুব শ্রদ্ধা করত। প্রায় ছয় বছর আগে তেলনজিয়া গ্রামের শিলা সাংমা ও প্রয়াত ফিলিপ রাংসার মেয়ে আনন্দিতা সাংমাকে বিয়ে করেন লুৎফুজ্জামান। তাদের চার বছর বয়সী মেয়ে প্রান্তি ও দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ান রয়েছে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে গিয়ে দেখা যায়, অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর ছোট ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে আছেন আনন্দিতা। স্বামীর মৃত্যুর খবরে ভেঙে পড়েছেন তিনি। আনন্দিতা বলেন, ‘এভাবে যে একজন মানুষকে কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলি করে মেরে ফেলবে, তা আমি কখনো ভাবতে পারিনি। বাচ্চাদের যখন ভাত খাওয়াচ্ছিলাম, তখন গুলির শব্দ পেয়ে প্রথমে ভাবছিলাম কেউ হয়তো ফটকা ফুটাচ্ছে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মানুষ বলাবলি করল, তাকে মেরে ফেলছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমি তো আমার স্বামীকে আর ফিরে পাব না। তবে যারা তাকে হত্যা করেছে, আমার অবুঝ দুটি শিশুকে পিতৃহারা করেছে, পুলিশ তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনুক। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পুলিশের একাধিক ইউনিট
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মাহফুজা খাতুন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলাম, দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমদ খান এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাদাত। পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে। তিনি জানান, ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির খোসা ও একটি অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর জেলার সব থানাকে সতর্ক করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। পাশাপাশি আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদকের নাম 






















