
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ঢাকার সাভারে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতে গ্যাস সংকট দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। শিল্প কারখানাগুলোয় উৎপাদন সচল রাখতে অতিরিক্ত ব্যয়ে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এ সংকট দ্রুত নিরসন না হলে দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। এদিকে, রান্নার চুলায় গ্যাস না থাকায় বিপাকে পড়েছেন বাসিন্দারা, আর সিএনজি স্টেশনগুলোয় ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে যানবাহন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের স্বল্পচাপ থাকলেও গত দুই মাসে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। তাদের দাবি, শিল্প কারখানা, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক এলাকায় দ্রুত স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। জানা গেছে, প্রায় দেড় বছর ধরে সাভার উপজেলার তালবাগ, ব্যাংক কলোনি, নামা গেন্ডাসহ কয়েকটি এলাকায় আবাসিক গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। সবচেয়ে বেশি ক্ষোভের বিষয় হলো, গ্যাস না পেলেও নিয়মিত বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে গ্রাহকদের।
আন্দোলনকারী রাজিব মাহমুদ বলেন, প্রায় দেড় বছর ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকলেও গত দুই মাসে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে। দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় আগুন থাকে না। অনেকেই হোটেল থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন, আবার কেউ বৈদ্যুতিক বা কাঠের চুলায় রান্না করছেন। এতে সংসারের মাসিক ব্যয় বেড়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে শুধু আশ্বাস মিললেও বাস্তবে কোনো উন্নতি হয়নি। দ্রুত স্থায়ী সমাধান না হলে কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হবেন বলে তিনি জানান। তালবাগ এলাকার লাবণ্য আমিন চৈত্র বলেন, সকাল কিংবা দুপুর কোনো সময়ই ঠিকমতো গ্যাস পাওয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে রান্না করতে না পেরে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এ সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে আমি হয়তো সামনের মাসে বাসা পরিবর্তন করে অন্য এলাকায় চলে যাব। আকলিমা আক্তার নামে এক নারী বলেন, প্রতি মাসে শুধু বিল দিই। লাইনে গ্যাস পাই না, চুলায় আগুন জ্বলছে না। অসহ্য বিড়ম্বনায় দিন কাটছে। মাসের পর মাস একদিকে গ্যাস বিল দিই, অন্যদিকে লাকড়ির চুলায় রান্না করি। দ্রুত গ্যাস সংকট সমাধান না হলে আর বিল দেব না।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। সাভারের রেডিও কলোনি এলাকার সাহারা সিএনজি স্টেশনের ক্যাশিয়ার বিজয় হোসেন জানান, একটি স্টেশন সচল রাখতে অন্তত তিন থেকে চার পিএসআই গ্যাস চাপ প্রয়োজন হলেও, গত এক সপ্তাহ প্রায় শূন্য পিএসআই চাপ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে শত শত যানবাহন স্টেশনে এলেও তাদের গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কখনো সামান্য চাপ এলে সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ৩০০ টাকার গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে। এতে চালকদের সঙ্গে প্রায়ই ভুল বোঝাবুঝি উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থা দীর্ঘদিন চললে স্টেশন পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়বে। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে শিল্প খাত। গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে অনেক কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। উইন্টার ড্রেস লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের কারখানায় প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী কোনোটিই মিলছে না।
ফলে উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে এবং সময়মতো ক্রেতাদের অর্ডার সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় প্রতি মাসে শুধু ডিজেল বাবদ ৩০ লাখ টাকার বেশি অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, লাভ কমছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রয়োজনে শিল্পাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। এ বিষয়ে তিতাস গ্যাসের গাজীপুর অঞ্চলের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গ্রাহকদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। কোথায় কী ধরনের সমস্যা রয়েছে, তা পর্যায়ক্রমে শনাক্ত করে গ্যাসের চাপ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সম্প্রতি কক্সবাজারের মহেশখালীতে এলএনজি সরবরাহের একটি ভাসমান টার্মিনালে কারিগরি জটিলতা দেখা দেওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে এবং অল্প সময়ের মধ্যে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রতিবেদকের নাম 























