
নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রথম বিয়ে ও দুই সন্তানের তথ্য গোপন করে দ্বিতীয় বিয়ে, দেনমোহর পরিশোধ নিয়ে বিরোধ এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর দায়ের করা মামলার জেরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর পরিদর্শক মো. কবির হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির তথ্য পাওয়া গেছে। গত ১১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বরিশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে এ পরোয়ানা জারি করা হয়েছে বলে মামলাসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কবির হোসেন বর্তমানে ঢাকা কর অঞ্চল-২৫-এর কর সার্কেল-৫৪৩-এর উপকমিশনারের কার্যালয়ে কর্মরত। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথম স্ত্রী ও দুই সন্তানের তথ্য গোপন করে তিনি পিরোজপুরের বাসিন্দা মো. বেলায়েত হোসেন শেখের মেয়ে হাফসা আক্তার বাবলিকে বিয়ে করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আদালতের আদেশসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সেলিম আহমেদের স্বাক্ষরিত আদেশে কবির হোসেনকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরোয়ানাটি কার্যকরের জন্য রাজধানীর পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফ হোসেনের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, কবির হোসেন পূর্বে বিবাহিত ছিলেন এবং তাঁর দুই সন্তান রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব তথ্য গোপন করে তিনি ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল হাফসা আক্তার বাবলিকে ৫০ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে রেজিস্ট্রি বিয়ে করেন। বিয়ের কয়েক মাস পর কবির হোসেন দ্বিতীয় স্ত্রীকে না জানিয়ে চলে যান এবং আগের স্ত্রীর কাছে ফিরে যান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় ফোন করে তালাকের কথা জানানোর পাশাপাশি দেনমোহর আদায়ে মামলা বা আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এ-সংক্রান্ত ফোনালাপের রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে বলে দাবি করেছেন মামলাসংশ্লিষ্ট পক্ষ। দ্বিতীয় স্ত্রী হাফসা আক্তার বাবলি তাঁর দেনমোহর আদায়ের জন্য আদালতের শরণাপন্ন হন। ওই মামলার পরিপ্রেক্ষিতেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে মামলার অভিযোগ, আদালতের আদেশ এবং পরোয়ানা কার্যকরের সর্বশেষ অবস্থা সংশ্লিষ্ট নথি থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কবির হোসেনের কয়েকজন সহকর্মীর দাবি, অতীতেও তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের ভাষ্য, বিভিন্ন ঘটনার পর তিনি মাঝেমধ্যে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকতেন এবং এ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দিয়েছিল। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির খবর পাওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে গেছেন বলেও একটি সূত্র দাবি করেছে। তবে তাঁর কর্মস্থলে উপস্থিতি, অনুপস্থিতি, কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পরোয়ানার বিষয়টি জানানোর বিষয়ে কোনো সরকারি নথি পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মুসলিম পারিবারিক আইনে দেনমোহর স্ত্রীর আইনগত অধিকার। দেনমোহর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা, বকেয়া অর্থ আদায় এবং বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অধিকার নির্ধারিত হয় প্রযোজ্য আইন ও বিবাহের শর্ত অনুযায়ী। এ ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ ও মামলার নথিই হবে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। কবির হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, দেনমোহরের অর্থ পরিশোধ এড়াতে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রীকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে একাধিক মামলা করেছেন। এর মধ্যে একটি মামলা আদালত খারিজ করেছেন বলেও মামলাসংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি। তবে মামলা খারিজের আদেশ, মামলাগুলোর প্রকৃতি এবং সেগুলোর সঙ্গে দেনমোহর বিরোধের সম্পর্ক যাচাই করা প্রয়োজন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক রেজিনা পারভীনের বক্তব্য অনুযায়ী, দেনমোহর নারীর অধিকার ও আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। কোনো নারীকে তাঁর প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা হলে বিষয়টি আইনগতভাবে মোকাবিলা করা উচিত বলে তিনি মত দিয়েছেন। নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও এ বিষয়ে যোগাযোগের কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষ। তাঁদের বক্তব্য, দেনমোহর নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নারীকে আইনগত সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর পরিদর্শক পদটি সরকারি বেতনকাঠামোর ১০ম গ্রেডের পদ। সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগত বিরোধ বা মামলার মুখোমুখি হলে সংশ্লিষ্ট অভিযোগের প্রকৃতি অনুযায়ী আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। কবির হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি তাঁর দাপ্তরিক অবস্থান ও আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে শুধু পরোয়ানা জারি হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়; মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কর পরিদর্শক মো. কবির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান এবং একটি বিকাশ নম্বর দিতে বলেন, যাতে তিনি ‘চা খরচ’ পাঠাতে পারেন। অন্যদিকে, পল্টন থানার ওসি মো. আরিফ হোসেনের কাছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পৌঁছেছে এবং আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং পরোয়ানা কার্যকরের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত করা গেলে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
প্রতিবেদকের নাম 



















