মোঃ কাইয়ুম হাসান, স্টাফ রিপোর্টার, ঠাকুরগাঁও
মাথার ওপর প্রখর সূর্য। তীব্র গরমে শরীর ক্লান্ত, তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাওয়ার উপক্রম। কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে ক্লান্তি নেই, আছে এক বুক স্বপ্ন। কাঁধে ব্যাগ, মাথায় সুরক্ষামূলক হেলমেট আর সাইকেলের সামনে পতপত করে উড়ছে লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা। এই দৃশ্য রংপুর থেকে শুরু হওয়া এক অদম্য তরুণের, যিনি সাইকেলের প্যাডেলে ভর করে চষে বেড়াচ্ছেন বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
এই স্বপ্নবাজ তরুণের নাম মোবাশ্বের আলী। উদ্দেশ্য কেবল ঘুরে বেড়ানো নয়; নিজ দেশকে চেনা, মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প জানা আর প্রকৃতির রূপসুধা কাছ থেকে অবলোকন করা।
চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল নিজের জন্মস্থান রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের বড় রাজারামপুর গ্রাম থেকে সাইকেল নিয়ে বের হন মোবাশ্বের। ইতিমধ্যেই তার অভিযানের ৩৯ দিন পেরিয়ে গেছে। যাত্রার শুরুতে তিনি পঞ্চগড় জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে বর্তমানে অবস্থান করছেন ঠাকুরগাঁওয়ে। প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিচ্ছেন এই তরুণ। এ পর্যন্ত দুটি জেলার ৮টি উপজেলায় ভ্রমণ সম্পন্ন করেছেন তিনি।
সাধারণ পরিবারের এক অসাধারণ সন্তান রংপুরের ঐতিহ্যবাহী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মোবাশ্বের আলী। তিনি বড় রাজারামপুর গ্রামের সাধারণ কৃষক দম্পতি রুহুল আমিন এবং মর্জিনা বেগমের কনিষ্ঠ সন্তান। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট মোবাশ্বেরের আর্থিক সচ্ছলতা হয়তো আকাশচুম্বী নয়, কিন্তু তার স্বপ্নের পরিধি বিশাল। ছোটবেলার সেই ভ্রমণের শখই আজ ডানা মেলেছে দেশজয়ের মহৎ উদ্দেশ্যে। তার চূড়ান্ত লক্ষ্য আরও বড়—ভবিষ্যতে সাইকেল বা অন্য কোনো মাধ্যমে বিশ্বভ্রমণে বের হওয়া।
ইচ্ছাশক্তি আর সাহস থাকলে কোনো সীমাবদ্ধতাই যে মানুষের স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারে না, মোবাশ্বের তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
মোবাশ্বেরের এই যাত্রা কেবল নিজের আনন্দ বা শখ পূরণের জন্য নয়। ভ্রমণের পাশাপাশি তিনি দেশের সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের মাঝে পরিবেশ সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন। টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করতে "প্রকৃতি বাঁচলে, বাঁচব আমরা"—এই স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি সবাইকে গাছ লাগানোর আহ্বান জানাচ্ছেন।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিম, রাজ্জাক ও আরিফ জানান:।"আজকের তরুণরা যখন মুঠোফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মগ্ন, তখন মোবাশ্বেরের মতো একজন যুবক সাইকেল নিয়ে দেশ চিনতে বের হয়েছে। এটা সত্যিই দারুণ এক উদ্যোগ। সে শুধু ঘুরছে না, পরিবেশ বাঁচানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছড়াচ্ছে।
পাহাড়-সম এই সফরের খরচ মোবাশ্বের জোগাচ্ছেন নিজের টিউশনি থেকে জমানো টাকা দিয়ে। পাশাপাশি পরিবারও তাকে সাধ্যমতো সমর্থন জোগাচ্ছে। তবে পথ চলতে গিয়ে দেশের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায় আপ্লুত মোবাশ্বের। তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষ তাকে পরম যত্নে বুকে টেনে নিচ্ছেন। কেউ বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করছেন, কেউবা থাকার জায়গা দিচ্ছেন। এই মানুষের ভালোবাসাই প্রতিদিন তাকে নতুন পথ চলার শক্তি জোগায়।
মোবাশ্বের আলীর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোহাম্মদ খোদাদাদ হোসেন। তিনি বলেন: "একজন শিক্ষার্থী হিসেবে দেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানুষকে জানার এই প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়। পরিবেশ রক্ষায় তার প্রচারণা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে দীর্ঘ পথ চলায় নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তাকে ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছি। তার এই যাত্রা সফল ও নিরাপদ হোক।
ঝড়-বৃষ্টি, তীব্র রোদ কিংবা শারীরিক ক্লান্তি—কোনো কিছুই থামাতে পারছে না মোবাশ্বেরকে। সব বাধা পেরিয়ে দুই চাকার ওপর ভর করে বাংলাদেশের মানচিত্র বুকে নিয়ে এগিয়ে চলছেন একবিংশ শতাব্দীর এই স্বপ্নসারথি।