তৌহিদ-উল বারী, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) :
তীব্র গরম, জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতির প্রভাবে আবারও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে লোডশেডিং। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের মানুষকেই এর বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। দিনের বিভিন্ন সময়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, কৃষিকাজ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, সেচ, পানি সরবরাহ থেকে শুরু করে গৃহস্থালির কাজ- সব ক্ষেত্রেই পড়ছে এর নেতিবাচক প্রভাব।
আজ বৃহস্পতিবার (১৩ আগষ্ট) রিপোর্ট লেখা অবধি তথ্যানুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা, কোথাও কোথাও ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন। পরিস্থিতি এতটাই তীব্র হয়েছে যে লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে জনরোষ ও বিদ্যুৎ অফিসে হামলার আশঙ্কায় দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অফিস ও উপকেন্দ্রের নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামেও তীব্র সংকট
চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের চিত্রও উদ্বেগজনক। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ চট্টগ্রাম দক্ষিণের আওতায় থাকা পটিয়া, বোয়ালখালী, আনোয়ারা, কর্ণফুলী, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া- এই আট উপজেলায় বর্তমানে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব এলাকায় প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে গ্রাহকদের। এই আট উপজেলায় পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ।
ফলে প্রচণ্ড গরমে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক এলাকায় পানির পাম্প চালানো যাচ্ছে না। ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ওয়ার্কশপ, হিমাগার, দোকানপাট ও অনলাইননির্ভর কাজেও পড়ছে বিরূপ প্রভাব।
বাঁশখালীতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই
দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম বড় উপজেলা বাঁশখালীতেও লোডশেডিংয়ের প্রভাব তীব্র। সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিবেদনে ২৪ ঘণ্টার বড় একটি সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাঁশখালীর বিশেষত্ব হলো- এই উপজেলাতেই রয়েছে দেশের অন্যতম বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট। অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি কেন্দ্র কাছেই থাকার পরও উপজেলার সাধারণ গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়ার বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাঁশখালীর ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টে ১ এপ্রিল ২০২৬ উৎপাদন হয়েছিল ১ হাজার ১৭০ মেগাওয়াট। পরে উৎপাদন সরাসরি অর্ধেকে নেমে আসে।
কেন বারবার লোডশেডিং?
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গ্যাস ও কয়লার সংকট, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সরবরাহে সীমাবদ্ধতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া এবং চাহিদার তুলনায় উৎপাদনের ঘাটতি।
২০২৬ সালের এপ্রিলেও দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। তখন সন্ধ্যার পিক আওয়ারে জাতীয় চাহিদা প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছানোর বিপরীতে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট ঘাটতির কথা উঠে আসে।
চট্টগ্রামেও একই সময়ে জ্বালানি সংকটে একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ ছিল। এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে জেলার ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ১০টি বন্ধ থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
কয়েক বছর ধরে ফিরে আসছে একই চিত্র
বাংলাদেশে লোডশেডিং নতুন কোনো সমস্যা নয়। বিশেষ করে ২০২২ সালের পর থেকে গ্রীষ্ম এলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৩ সালের মে মাসে এক পর্যায়ে জাতীয় পর্যায়ে ১ হাজার ৪৫১ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের তথ্য জানিয়েছিল পিডিবি; তখন বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৩ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট।
২০২৪ সালেও নিয়মিত লোডশেডিং অব্যাহত থাকার কথা উঠে এসেছে বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন বিশ্লেষণে।
তবে ২০২৬ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে পরিস্থিতির সাময়িক উন্নতি হয়েছিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২৭ এপ্রিল থেকে ৩ মে পর্যন্ত টানা এক সপ্তাহ দেশে উল্লেখযোগ্য লোডশেডিং হয়নি- উৎপাদন চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
কিন্তু কয়েক মাস না যেতেই ফের উল্টো চিত্র দেখা দিয়েছে। আগস্টে তীব্র গরম ও জ্বালানি সংকটের কারণে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেড়েছে। ১০ আগস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্যাস সংকট, জ্বালানি স্বল্পতা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
উৎপাদন বাড়লেও কেন গ্রামের মানুষ অন্ধকারে?
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়লেও সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈষম্য ও জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে গ্রামাঞ্চলের মানুষ অনেক সময় বেশি সময় বিদ্যুৎহীন থাকছেন। বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকায় চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কমে গেলে স্থানীয়ভাবে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, দেশের প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি গ্রাহক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায়। ফলে উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সংকট তৈরি হলে এর বড় প্রভাব পড়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর।
অন্ধকারে শিক্ষা ও অর্থনীতি
লোডশেডিং শুধু মানুষের স্বস্তি কেড়ে নিচ্ছে না, ক্ষতিগ্রস্ত করছে গ্রামীণ অর্থনীতিকেও। বিদ্যুৎনির্ভর দোকান, সেলুন, ফ্রিজ-নির্ভর ব্যবসা, ওয়ার্কশপ, মৎস্য ও পোলট্রি খামারসহ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কৃষকদের সেচ ব্যবস্থাতেও তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।
অন্যদিকে এইচএসসি ও অন্যান্য পরীক্ষার সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থীকে বিকল্প আলোতে পড়তে হচ্ছে।
সমাধান কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংস্কার, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং উৎপাদন-বিতরণ ব্যবস্থায় সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি না থাকলে কেন্দ্র চালানো যায় না; আবার বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতায় গ্রাহকের কাছে তা পৌঁছানো সম্ভব হয় না।
বাঁশখালীর মতো এলাকায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে উপজেলার কাছেই রয়েছে ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র, অন্যদিকে স্থানীয় গ্রাহকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে। তাই শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো নয়, উৎপাদিত বিদ্যুতের সুফল গ্রাম ও প্রত্যন্ত এলাকার সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
গ্রামীণ মানুষের প্রশ্ন একটাই- বিদ্যুৎকেন্দ্র বাড়ছে, বিদ্যুতের দামও বাড়ছে; তাহলে তাদের ঘরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ কবে পৌঁছাবে?