তৌহিদ-উল বারী, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
কোমরসমান বন্যার পানি। কোথাও তীব্র স্রোত, কোথাও ডুবে গেছে গ্রামের পর গ্রাম। রাস্তাঘাট হারিয়ে গেছে পানির নিচে। যানবাহন থেমে গেছে অনেক আগেই। অথচ ঠিক সেই পথেই এগিয়ে চলেছে একদল তরুণ। কারও কাঁধে ভারী ত্রাণের বস্তা, কারও হাতে বিশুদ্ধ পানির বোতল, কারও গায়ে লাইফ জ্যাকেট। ক্লান্ত শরীর নিয়েও তাদের চোখে নেই কোনো হতাশা, নেই কোনো বিরক্তি- আছে শুধু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দৃঢ় অঙ্গীকার।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ভয়াবহ বন্যার এই দুর্যোগে এমনই এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাঁশখালী স্টুডেন্টস ফোরাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
বন্যায় যখন হাজারো পরিবার ঘরবন্দী, অনেকেই খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে দিন কাটাচ্ছেন, তখন এই তরুণরা নিজেদের আরাম-আয়েশের কথা ভুলে নেমে পড়েছেন মাঠে। কখনো ট্রাক থেকে ত্রাণ নামিয়ে কাঁধে তুলে নিচ্ছেন, কখনো পানির স্রোত ঠেলে ভেলায় করে দুর্গম এলাকায় পৌঁছে দিচ্ছেন খাদ্যসামগ্রী। আবার কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরপানি মাড়িয়ে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছেন মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সহায়তা।
তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন বলে দেয়- মানবতার কাছে কোনো বাধাই বড় নয়।
ছবিতে দেখা যায়, স্বেচ্ছাসেবীরা দলবদ্ধভাবে ত্রাণের বস্তা নিয়ে তক্তা আর কলা গাছের ভেলা বানিয়ে ছুটছেন। বিশুদ্ধ পানির বোতল কাঁধে নিয়ে বন্যার পানির মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন দুর্গত মানুষের কাছে। কোথাও স্থানীয়দের সহযোগিতায় ভেলায় ত্রাণ তুলে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার পানিবন্দী পরিবারগুলোর হাতে সরাসরি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে সহায়তা। প্রতিটি দৃশ্যই মানবিকতার এক একটি জীবন্ত দলিল।
শুধু ত্রাণ বিতরণ নয়, দুর্গত মানুষের খোঁজ নেওয়া, কোথায় কী প্রয়োজন তা নিরূপণ করা এবং যেসব এলাকায় এখনো সহায়তা পৌঁছায়নি, সেসব স্থানে পৌঁছানোর চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিতে হলেও পিছিয়ে যাননি কেউ।
এই তরুণদের কাছে স্বেচ্ছাসেবক হওয়া কোনো পরিচয় নয়; এটি একটি দায়িত্ব। যে দায়িত্ব শেখায়- মানুষের বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় মানবিকতা।
আজকের এই সময়ে, যখন ব্যক্তিস্বার্থকে অনেকেই জীবনের প্রধান লক্ষ্য মনে করেন, তখন বাঁশখালী স্টুডেন্টস ফোরামের এই উদ্যোগ আমাদের নতুন করে আশাবাদী করে। তারা দেখিয়ে দিয়েছেন, সমাজ বদলাতে বড় পদ বা বিপুল সম্পদের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন শুধু একটি মানবিক হৃদয় এবং কাজ করার আন্তরিক ইচ্ছা।
বন্যার পানিতে ভিজে যাওয়া তাদের পোশাক একদিন শুকিয়ে যাবে, কাঁধের ব্যথাও হয়তো মিলিয়ে যাবে। কিন্তু অসহায় মানুষের মুখে যে স্বস্তির হাসি তারা ফিরিয়ে দিয়েছেন, সেই হাসির স্মৃতি বহুদিন বেঁচে থাকবে। ভবিষ্যতে যখন এই দুর্যোগের ইতিহাস লেখা হবে, তখন হয়তো পরিসংখ্যানের পাশাপাশি জায়গা করে নেবে এমন কিছু নীরব নায়ক, যারা কোনো প্রচারের জন্য নয়, শুধুমাত্র মানবতার টানে ছুটে গিয়েছিলেন মানুষের দুয়ারে।
এই তরুণদের গল্প শুধু একটি সংগঠনের কার্যক্রমের গল্প নয়; এটি নতুন প্রজন্মের দায়িত্ববোধ, সাহস, সহমর্মিতা এবং মানবিক চেতনার গল্প। তাদের এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, দুর্যোগ যত বড়ই হোক, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা তার চেয়েও বড়।
বাঁশখালীর বন্যার্ত মানুষের কাছে তারা পৌঁছে দিয়েছেন ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা। আর পুরো সমাজের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন আরও মূল্যবান একটি বার্তা- মানবতার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো নিঃস্বার্থ সেবা।
এই অনুপ্রেরণাদায়ী উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আরও অনেক তরুণকে মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসতে সাহস জোগাবে। কারণ, সমাজের সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো জ্বলে ওঠে তখনই, যখন কিছু মানুষ নিজের স্বার্থের চেয়ে অন্যের কষ্টকে বড় করে দেখতে শেখে। আর সেই আলোরই এক উজ্জ্বল নাম- বাঁশখালী স্টুডেন্টস ফোরাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।