এম. ওমর হাসনাত, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি: মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকাময় দিনগুলো বুকে নিয়ে, দীর্ঘ অবহেলা আর সামাজিক গ্লানির বিরুদ্ধে সারাজীবন লড়ে যাওয়া বীরাঙ্গনা টেপরি রাণী বিদায় নিলেন।১২ মে মঙ্গলবার রাত্রে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলাধীন নন্দুয়ার ইউনিয়নের বলিদ্বারা গ্রামে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।১৩ মে বুধবার সকালে মুক্তিযুদ্ধের সাহসী বীরাঙ্গনা শ্রী টেপরী রানী কে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শ্রদ্ধা জ্ঞাপন শেষে নিজ ধর্মীয় কার্য সম্পন্ন করে সমাহিত করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা বেগম, রাণীশংকৈল থানার ওসি (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
👉 এখন শুনুন ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায় সাহসী বীরাঙ্গনা টেপরী রাণীর সেই লোমহর্ষক করুন গল্প :ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকৈলের মেয়ে টেপরি রাণী। টেপরির বয়স তখন ১৬-১৭ এর মত হবে। প্রতিদিন বাবা ভাইয়ের সাথে ভয়ে ভয়ে কাটে তাঁর দিন। প্রতিদিনই মনে হয় এই বুঝি পাঞ্জাবিরা এসে তাদের মেরে ফেলবে। এপ্রিলের শেষদিকে টেপরির গ্রামের এক নেতৃস্থানীয় লোক তার বাবা ভাইকে বলেন, "যদি তোমরা তোমাদের এই মেয়েটাকে পাকিস্তানি ক্যাম্পে পাঠিয়ে দাও তাহলে এই মেয়ের উছিলায় তোমরা পুরো পরিবার বেঁচে যেতে পারো। কোন উপায় না পেয়ে তাঁর বাবা তাকে পাশের পাকিস্তানি ক্যাম্পে দিয়ে আসেন। প্রায় সাত মাস টেপরি পাকিস্তানি ক্যাম্পে ছিল। তাঁর কাছে প্রতিরাতেই আসতো চারজন পাকিস্তানি শুয়োর। পালাক্রমে প্রতিদিনই ধর্ষণ করতো তারা। এভাবেই দীর্ঘ সাত মাস নিজের দেহের বিনিময়ে নিজের পরিবারকে রক্ষা করে টেপরি রাণী।
দেশ স্বাধীন হলে পাকিস্তানি ক্যাম্প থেকে তার বাবা তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। টেপরি ততদিনে গর্ভবতী। গ্রামের লোকজন আর টেপরি গর্ভের বাচ্চাটাকে নষ্ট করতে চাইলে, তার বাবা তাকে বলে "রেখে দে মা, তোর তো আর কেউ হবে না শেষ বয়সে তোর সম্বল হবে এই বাচ্চাটি।"অবশেষে টেপরির গর্ভ থেকে জন্ম হয় ছেলে সন্তানের। ছেলের নাম রাখা হয় সুধীর বর্মন।ছোট থেকেই সুধীরের সাথে কেউ খেলতো না, তার থেকে সবাই দূরে দূরে থাকতো। তাকে সবসময় পাঞ্জাবির বাচ্চা, জারজ ইত্যাদি বলে ডাকতো, আর অনেক অপমান করতো। কিন্তু সুধীর কিছুই বলতো না। কেন কোনো প্রতিবাদ করতো না সুধীরকে একবার প্রশ্ন করায় সুধীর বলেছিল "ঝগড়া করতে তো লোক লাগে, কিন্তু আমার কে আছে"? জীবনটা তার ফাঁকা ফাঁকা লাগে। এভাবেই একাকী ভ্যানচালক সুধীরের জীবন কাটে।
সুধীরের পরিবারে সুধীর, তার মা, বউ আর একটা মেয়ে। কিন্তু আজ তার মা টেপরি রাণী চলে গেলেন বিদায় নিয়ে। গ্রামের কারো সাথে সুধীরের পরিবারের সম্পর্ক নেই। সুধীরের মেয়েটা পড়াশোনা করে। এ মেয়েটাকে সুধীর নিজের মত করে বড় করেছে। মেয়ের নাম রেখেছে জনতা।জনতা দুঃখভরা হৃদয়ে বলে উঠে- "দেশে আর যুদ্ধ হবে না, দাদীর মতো পরিবার আর দেশের জন্য নিজের সম্ভ্রম দিতে হবে না।"মৃত্যুর আগে টেপরি এক কথায় বলেছিল -"সেই চার পশুকে কোনদিনও ভুলতে পারবো না এবং এখনো সে জানে কার মত হয়েছে সুধীর!