কায়সার আশ্রাফীঃ চট্টগ্রাম মহানগর প্রতিনিধি
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আকস্মিক পরিদর্শনে এমন বহু ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে ষষ্ঠ, সপ্তম এমনকি অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও সাবলীলভাবে বাংলা পাঠ্যবই পড়তে পারছে না। কোথাও শিক্ষার্থী শব্দ চিনতে পারছে না, কোথাও বাক্য ভেঙে যাচ্ছে, আবার কোথাও পড়তে পারলেও অর্থ বুঝতে পারছে না। এসব ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বাস্তবতা নয়; বরং বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার বুনিয়াদি দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ।
শিক্ষার মূল ভিত্তি তিনটি—পড়া, লেখা ও গণনা। এর মধ্যে পড়ার দক্ষতা বা Reading Fluency দুর্বল হলে অন্য সব শিক্ষণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। কারণ শিক্ষার্থী যদি পাঠ্যবইয়ের ভাষাই বুঝতে না পারে, তবে বিজ্ঞান, গণিত, সমাজবিজ্ঞান কিংবা ধর্মীয় শিক্ষার জ্ঞানও তার কাছে অধরাই থেকে যায়।
কেন বাড়ছে রিডিং সংকট?
এই সংকটের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে।
প্রথমত, অনেক শিক্ষার্থী বর্ণ, ধ্বনি, শব্দ ও বাক্য গঠনের মৌলিক দক্ষতা অর্জন না করেই এক শ্রেণি থেকে অন্য শ্রেণিতে উন্নীত হচ্ছে। ফলে প্রাথমিকের দুর্বল ভিত্তি মাধ্যমিকে এসে প্রকট আকার ধারণ করছে।
দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়গুলোতে ধ্বনিভিত্তিক শিক্ষা (Phonics), উচ্চারণ অনুশীলন, সাবলীল পাঠ এবং বোধগম্য পাঠের ওপর পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে মুখস্থনির্ভর শিক্ষা পাঠাভ্যাসকে দুর্বল করে দেয়।
তৃতীয়ত, শিশুদের হাতে বই কম, কিন্তু মোবাইলের পর্দা বেশি। পরিবার ও সমাজে বই পড়ার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ায় শিশুরাও পাঠের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
চতুর্থত, ধারাবাহিক মূল্যায়নের দুর্বলতার কারণে তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণিতে যে শিক্ষার্থীর পাঠদক্ষতায় ঘাটতি রয়েছে, তা সময়মতো শনাক্ত ও সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে পাঠদক্ষতা শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের প্রতি মিনিটে নির্দিষ্ট সংখ্যক শব্দ সাবলীলভাবে পড়ার সক্ষমতাকে শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে ধরা হয়।
সাধারণভাবে—
- ১ম শ্রেণি: প্রতি মিনিটে ৪০–৬০ শব্দ
- ২য় শ্রেণি: ৬০–৯০ শব্দ
- ৩য় শ্রেণি: ৯০–১২০ শব্দ
- ৪র্থ–৫ম শ্রেণি: ১২০–১৫০ শব্দ
- ৬ষ্ঠ শ্রেণি ও তদূর্ধ্ব: ১৫০–১৮০ শব্দ বা তার বেশি
পড়তে পারার পাশাপাশি অর্থ বোঝা, সঠিক উচ্চারণ, বিরামচিহ্ন অনুসরণ এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পাঠ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের বহু শিক্ষার্থী এই মানদণ্ড থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ফলে মাধ্যমিকে গিয়ে তাদের শিখনগত দুর্বলতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
পাঠদক্ষতা উন্নয়নে জাতীয় কর্মসূচি প্রয়োজন
বাংলাদেশে এখন একটি জাতীয় পাঠদক্ষতা আন্দোলন (National Reading Movement) গড়ে তোলার সময় এসেছে।
১. প্রতিদিন বাধ্যতামূলক ‘রিডিং আওয়ার’
প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রতিদিন অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট উচ্চস্বরে পাঠ (Read Aloud) বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষার্থীরা গল্প, কবিতা, সংবাদপত্র, জীবনী কিংবা পাঠ্যবই থেকে পাঠ করবে।
২. শ্রেণিভিত্তিক রিডিং বেঞ্চমার্ক
প্রতিটি শ্রেণির জন্য নির্দিষ্ট পাঠমান নির্ধারণ করতে হবে। শিক্ষার্থী বছরে অন্তত তিনবার রিডিং টেস্টে অংশ নেবে এবং তার অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হবে।
৩. বিদ্যালয়ভিত্তিক পাঠাগার ও বুক কর্নার
প্রতিটি বিদ্যালয়ে সমৃদ্ধ পাঠাগার এবং প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে ছোট বুক কর্নার থাকতে হবে। শিশুরা যাতে আনন্দের সঙ্গে বই হাতে নিতে পারে, সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
৪. রেমিডিয়াল ও সাপোর্ট ক্লাস
যেসব শিক্ষার্থী পিছিয়ে আছে, তাদের জন্য বিশেষ সহায়ক ক্লাস চালু করতে হবে। বর্ণচর্চা, শব্দচর্চা, যুক্তবর্ণ পাঠ, ছোট বাক্য পড়া এবং বোধগম্যতা উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
৫. ধ্বনিভিত্তিক শিক্ষা ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ
শিক্ষকদের Phonics, Reading Fluency, Reading Comprehension এবং Storytelling-এর ওপর আধুনিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কারণ দক্ষ পাঠক তৈরির প্রথম শর্ত দক্ষ শিক্ষক।
৬. আবৃত্তি ও সংবাদপত্র পাঠ
প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত কবিতা আবৃত্তি, গল্প বলা, সংবাদপত্র পাঠ এবং বই আলোচনা কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। এতে ভাষা, উচ্চারণ ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।
৭. এক মিনিটের রিডিং চ্যালেঞ্জ
বিদ্যালয়গুলোতে “One Minute Reading Challenge” চালু করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা এক মিনিটে কত শব্দ সঠিকভাবে পড়তে পারে, তা মূল্যায়ন করা হবে।
৮. পাঠ প্রতিযোগিতা ও পাঠ উৎসব
- সেরা পাঠক নির্বাচন
- মাসসেরা পাঠক পুরস্কার
- বই পর্যালোচনা প্রতিযোগিতা
- গল্প বলা প্রতিযোগিতা
- পাঠ উৎসব
- পাঠক ক্লাব
এসব কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
৯. শব্দ ও বাক্যভিত্তিক খেলাধুলা
শব্দজট, শব্দ খোঁজা, বাক্য গঠন, বর্ণ দিয়ে খেলা, যুক্তবর্ণ প্রতিযোগিতা, ভাষাভিত্তিক কুইজ—এসব কার্যক্রম শেখাকে আনন্দময় করে তুলতে পারে।
১০. পরিবারকে সম্পৃক্ত করা
প্রতিটি পরিবারকে প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট সন্তানকে বই পড়ে শোনাতে বা তার পড়া শুনতে উৎসাহিত করতে হবে। শিশুর পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার সবচেয়ে কার্যকর জায়গা হলো পরিবার।
জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত
শিক্ষার্থীরা যদি সাবলীলভাবে পড়তে না পারে, তবে ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা কিংবা দক্ষ নাগরিক তৈরির স্বপ্নও অপূর্ণ থেকে যাবে। তাই পাঠদক্ষতা উন্নয়নকে কেবল একটি শিক্ষাগত কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
আজ প্রয়োজন নতুন ভবন নয়, নতুন পাঠক; শুধু পরীক্ষায় পাস নয়, অর্থবহ শিক্ষা; শুধু সনদ নয়, দক্ষতা।
বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুর হাতে বই পৌঁছাক, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ হোক পাঠের আনন্দভূমি, প্রতিটি বিদ্যালয় হোক পাঠদক্ষতা বিকাশের কেন্দ্র। তাহলেই আমরা এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারব, যারা শুধু পড়তে জানবে না—পড়ে বুঝবে, চিন্তা করবে, প্রশ্ন করবে এবং দেশকে এগিয়ে নেবে।