মোঃ সৈয়দ মিয়া চট্টগ্রাম ব্যুরো: বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রীর মৃত্যুর প্রতিবাদে মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ; ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবি শুনলেন জেলা প্রশাসক, ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ ও অবৈধ পার্কিং বন্ধের আশ্বাস
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সড়ক দুর্ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী মাইশা মুশফিরাতের মৃত্যুর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের টানা প্রায় ছয় ঘণ্টার মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ অবশেষে প্রত্যাহার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সরাসরি হস্তক্ষেপ, ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের দাবি শোনা এবং দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাসের পর মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে অবরোধ তুলে নেন আন্দোলনকারীরা।
এর আগে সীতাকুণ্ডের কুমিরায় লরির ধাক্কায় একটি বাস উল্টে গেলে বাসটির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মাইশা মুশফিরাত। এ ঘটনায় রাজিয়া নামে আরও এক শিক্ষার্থী আহত হন। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করলে চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রী ও সাধারণ মানুষ। মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের পাশাপাশি রেল চলাচলও ব্যাহত হয়।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই আহত শিক্ষার্থীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। একই সঙ্গে নিহত মাইশার বাবা দিদারুল আলমের সঙ্গে কথা বলে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেন এবং পরিবারের প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রথমে ঘটনাস্থলে যান সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তবে শিক্ষার্থীরা জেলা প্রশাসকের সরাসরি উপস্থিতির দাবি জানালে তিনি নিজেই ঘটনাস্থলে ছুটে যান। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম, আনসার ও ভিডিপির জেলা কমান্ড্যান্ট মো. সেফাউল হোসেন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ শিক্ষক ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ সময় মহাসড়কে নিহত মাইশার জানাজায় অংশ নেন জেলা প্রশাসকসহ উপস্থিত কর্মকর্তারা। পরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি এবং তাঁদের উত্থাপিত দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন।
জেলা প্রশাসক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের দাবিগুলো শোনার আগেই আমি আমার মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। সড়ক ও জনপথ বিভাগের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গেও কথা বলেছি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসংলগ্ন এলাকায় ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আজকেই ফুটওভার ব্রিজের জন্য লিখিতভাবে জানাব, যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এখানে ফুটওভার ব্রিজটি নির্মাণ করা যায়।’ পাশাপাশি মহাসড়কের দুই পাশে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণেরও আশ্বাস দেন তিনি।
সড়কে অবৈধ লরি পার্কিং বন্ধের বিষয়ে জেলা প্রশাসক কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, ‘কোনো অবৈধ পার্কিং এখানে থাকবে না। কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান যদি রাস্তা দখল করে লরি বা গাড়ি রাখে, সেগুলো আমরা রাস্তায় রাখতে দেব না।’ একই সঙ্গে রেললাইনের পাশের অবৈধ স্থাপনাও উচ্ছেদের আশ্বাস দেন তিনি।
দুর্ঘটনায় জড়িত লরিচালককে দ্রুত আইনের আওতায় আনার বিষয়ে পুলিশ সুপারের পক্ষ থেকেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে শিক্ষার্থীদের জানান জেলা প্রশাসক।
নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে তিনি বলেন, পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী লরির মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সরকারের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মামলা দায়ের, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুর্ঘটনায় জড়িত চালককে গ্রেপ্তার এবং চালক ও মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, কেডিএস ডিপোর অবৈধ পার্কিং বন্ধ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ, নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং নিরাপদ সড়ক পারাপার নিশ্চিত করা।
দীর্ঘ সময় ধরে অবরোধ চলায় অ্যাম্বুলেন্সসহ অসংখ্য যানবাহন আটকে পড়ার বিষয়টি তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক।
তিনি শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘আমরা আপনাদের কথা দিচ্ছি, আপনাদের যে দাবিগুলো আছে, সেগুলো আমরা স্বল্পতম সময়ের মধ্যে পূরণ করব।’
জেলা প্রশাসকের এমন আশ্বাস এবং প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর অবশেষে অবরোধ প্রত্যাহার করেন শিক্ষার্থীরা। এতে দীর্ঘ ছয় ঘণ্টার অচলাবস্থার অবসান ঘটে এবং মহাসড়কে যান চলাচল ও রেল চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পথ সুগম হয়