কাজী আন্নিল তানভীর, স্টাফ রিপোর্টার: ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকায় রাতের আঁধারে নয়, এখন দিনের আলোতেই দেদারসে চলছে মাদকের রমরমা ব্যবসা। ভয়ংকর ও প্রাণঘাতী এই বিষ এখন শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের হাতে অবাধে পৌঁছে যাচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেশ কিছু বড় অভিযান চললেও স্থানীয় সিন্ডিকেটের কারণে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না এই মরণব্যাধি। যেসব এলাকায় চলছে প্রকাশ্য কেনাবেচা সরেজমিনে দৈনিক আজকের জনবানী’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, কেরানীগঞ্জের বেশ কিছু স্পটে এখন প্রকাশ্যেই মাদক কেনাবেচা হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য এলাকাগুলো হলো: আগানগর ও জিনজিরা, আমবাগীচা খেলার মাঠ, জেলেপাড়া ও খালপাড়, নতুন শুভাঢ্যা, কালীগঞ্জ ও কদমতলী, ইস্পাহানি ও চুনকুটিয়া, বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়, বিড়িবাঁধ রোড, থানা রোড ও ভাগনা। স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন— গাঁজা, হেরোইন, ফেনসিডিল ও ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক কোথা থেকে আসছে, কারা এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং কীভাবে তা জালের মতো ছড়িয়ে পড়ছে? ভয়ে মুখ খুলছেন না স্থানীয়রা কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে অধিকাংশই ভয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। তাদের দাবি, মাদক সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এতটাই ভয়াবহ যে, এদের বিরুদ্ধে কথা বললেই নেমে আসে নির্যাতন। অতীতে মাদককে কেন্দ্র করে একাধিক সংঘর্ষ, হত্যা ও ধর্ষণের মতো নৃশংস ঘটনা ঘটায় পুরো এলাকা এখন আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। কদমতলী এলাকার এক মুদি দোকানদার ক্ষোভ ও আতঙ্ক প্রকাশ করে বলেন, আমার চোখের সামনে মাদক বিক্রিতে বাধা দেওয়ায় তারা আমাকে মারাত্মকভাবে আঘাত করেছে, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে।
এরপর থেকে আমি আর এসব বিষয়ে কথা বলি না। অনেকেই আমার মতো ভয়ে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমাদের জন্য আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়ের ভ্রাম্যমাণ মুড়ি বিক্রেতা রাসেল মিয়া বলেন, "প্রতিদিনই চোখের সামনে মাদক কেনাবেচা হতে দেখি। কেউ কিছু বলে না। আমরা গরিব মানুষ, এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না। তবে মাদক খুবই খারাপ জিনিস, তরুণদের শেষ করে দিচ্ছে।" এদিকে, সরেজমিনে মাদক কিনতে আসা কয়েকজন যুবকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তারা সংবাদকর্মী দেখে দৌঁড়ে পালিয়ে যায়। প্রশাসনের বক্তব্য ও অভিযান, সাম্প্রতিক সময়ে র্যাব-১০ এবং ঢাকা জেলা ডিবি পুলিশ কেরানীগঞ্জের গোলাম বাজার ও শুভাঢ্যাসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ গাঁজা, ফেনসিডিল ও ইয়াবাসহ বেশ কয়েকজন পেশাদার মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, মূল হোতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে। মাদক চোরাচালান ও কেনাবেচার বিষয়ে জানতে চাইলে কেরানীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিলুল হক দৈনিক আজকের জনবানীকে বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। তবে পুলিশের পাশাপাশি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরেরও দায়িত্ব রয়েছে। মাদক নির্মূলে তাদের আরও সক্রিয় সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। অন্যদিকে, ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, আমরা অব্যাহতভাবে মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছি। মাদকের সমস্যা শুধু কেরানীগঞ্জে নয়, সারা দেশেই এর ভয়াবহতা রয়েছে। মাননীয় আইজিপি মহোদয়ের নির্দেশক্রমে বিশেষ অভিযান চলছে। ইতোমধ্যে মাদকের বিরুদ্ধে সাতটি মামলা হয়েছে। জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পুলিশের প্রতি সার্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করা সম্ভব।" স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু সাময়িক অভিযান নয়, কেরানীগঞ্জকে মাদকমুক্ত করতে প্রশাসন যেন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রেখে মূল সিন্ডিকেট প্রধানদের আইনের আওতায় আনে।