জিএম মাকছুদুর রহমান, কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি: কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলায় গোমতী নদীর বেড়িবাঁধ সড়কে এক নজিরবিহীন চুরির ঘটনা ঘটেছে। সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয়ে স্থাপিত সোলার লাইট প্রকল্পের ওপর চোখ পড়েছে সংঘবদ্ধ চোর ও সীমান্ত অপরাধী চক্রের। গত কয়েক মাসে ধাপে ধাপে এই সড়কের দুই শতাধিক সোলার বাতি চুরি করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। কোনো কোনো জায়গায় বাতি কাটার পাশাপাশি আস্ত লোহার খুঁটিও উপড়ে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সরকারের অন্তত সোয়া কোটি টাকার মূল্যবান জাতীয় সম্পদ নষ্ট হয়েছে এবং পুরো ৫ কিলোমিটার এলাকা এখন রাতে ভুতুড়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকছে। এই অন্ধকারের সুযোগে সীমান্তে চোরাচালান ও ছিনতাইয়ের আশঙ্কা প্রকট হওয়ায় স্থানীয় লাখো মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কুমিল্লা সদর উপজেলার পালপাড়া থেকে গোলাবাড়ি পর্যন্ত গোমতী নদীর বেড়িবাঁধের ৬ কিলোমিটার অংশে ৫ শতাধিক অত্যাধুনিক সোলার লাইট স্থাপন করা হয়েছিল। প্রতিটি সোলার লাইট স্থাপনে সরকারের ব্যয় হয়েছিল অন্তত ৫৮ হাজার টাকা এবং পুরো প্রকল্পে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় তিন কোটি টাকা। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পর পাঁচথুবী ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামের অন্তত লক্ষাধিক মানুষের রাতে যাতায়াত নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হয়েছিল। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ ও নজরদারির অভাবে জনসাধারণ সেই স্বস্তি হারিয়ে এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। সম্প্রতি সরেজমিনে পাঁচথুবী ইউনিয়নের গোলাবাড়ি থেকে টিক্কারচর হয়ে ভারত সীমান্তবর্তী শাহাপুর গ্রাম পর্যন্ত গিয়ে দেখা গেছে, সড়ক জুড়ে সারি সারি সোলার প্যানেলের খুঁটি দাঁড়িয়ে থাকলেও কোনোটির মাথায় বাতি নেই। ব্যস্ততম টিক্কারচর গোমতী সেতুর ওপর একটি লাইটেও এখন আর আলো জ্বলে না।
চোরেরা সোলার প্যানেলের মাথার বাতিসহ সামনের অংশটি কেটে কেটে নিয়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ধাপে ধাপে এসব মূল্যবান বাতি গায়েব করা হলেও প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি ছিল না। প্রশাসনের এই উদাসীনতার কারণেই চোর চক্র দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে। পাঁচথুবী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কাজী তানভীর আহমেদ রাহুল বলেন, যেহেতু এটি একটি ভারত সীমান্তমুখী সড়ক, তাই চোরাকারবারিরা তাদের অবৈধ ব্যবসা ও পারাপার নির্বিঘ্ন করতে রাতের অন্ধকারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। আর এই উদ্দেশ্যেই তারা পরিকল্পিতভাবে বাতিগুলো চুরি করেছে। এখন এই সুযোগে সাধারণ ছিনতাইকারীদের উৎপাতও বেড়েছে। সড়কটি অন্ধকারে ডুবে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নারী, শিক্ষার্থী ও রাতে চলাচলকারী চালকেরা। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সাদিয়া ইসলাম জানান, আগে আলো থাকার কারণে টিউশনি সেরে রাতে একা ফিরতেও ভয় লাগত না। কিন্তু এখন পুরো রাস্তা অন্ধকারে ডুবে থাকায় প্রতিদিন চরম আতঙ্ক নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। স্থানীয় অটোরিকশা চালক অহিদুর রহমান জানান, আগে লাইটগুলো যখন জ্বলত, তখন অনেক রাত পর্যন্ত মানুষ শহরে আসা-যাওয়া করত। এখন ছিনতাইয়ের ভয়ে সন্ধ্যা নামলেই পুরো রাস্তা নিঝুম হয়ে যায়, চালকেরাও এই রুটে গাড়ি চালাতে ভয় পান। সুবর্ণপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মিজানুর রহমান গোলদার এই চুরির ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমান্ত সড়ক মাসের পর মাস অন্ধকারে ডুবে থাকা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসকারী এই চোরদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং অবিলম্বে সড়কে পুনরায় আলো নিশ্চিত করতে হবে। কোটি টাকার ওপর মূল্যের সোলার বাতি চুরির এই ঘটনাটি জানার পর তদন্ত কমিটি গঠন করার কথা জানিয়েছেন কুমিল্লা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা তুজ জোহরা। তিনি বলেন, "আমি নিজে সড়কটি পরিদর্শনে গিয়েছি এবং দেখেছি যে সন্ধ্যার পর সড়কটি সম্পূর্ণ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে, যা জননিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের খুঁজে বের করা হবে এবং সড়কে পুনরায় আলোর ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসান বিষয়টির গুরুত্ব স্বীকার করে বলেন, "আমরা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। ইতিমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন জড়িতদের দ্রুত খুঁজে বের করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। একই সঙ্গে জনস্বার্থে খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে সোলার বাতিগুলো পুনঃস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।" তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু নতুন বাতি স্থাপনই যথেষ্ট নয়; সীমান্ত সড়কের সম্পদ রক্ষা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই বেড়িবাঁধ সড়কে নিয়মিত পুলিশ ও বিজিবির টহল জোরদার করা একান্ত প্রয়োজন।