নিজস্ব প্রতিবেদক: বাবা-মা নেই, নেই ভাইও। নিজের সংসারও গড়া হয়নি। ছোটবেলা থেকেই বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী নাজমা আক্তারের জীবনে আপন বলতে একমাত্র ছোট বোন। বয়স ৬৫ পেরিয়েছে। এর মধ্যে শরীরে বাসা বেঁধেছে হৃদ্রোগ ও কিডনির সমস্যা। নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়, প্রয়োজন চিকিৎসারও। কিন্তু নিজের কোনো আয় নেই। ছোটবোনের সামান্য উপার্জনেই চলে দুজনের সংসার। অনেক সময় ওষুধ কেনা কিংবা পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এমন বাস্তবতায় নাজমা ও তার ছোট বোন আছমা আক্তারের জীবনে কিছুটা স্বস্তি নিয়ে এসেছে ঢাকা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ। নাজমার চিকিৎসা ও জীবনযাপনের দায়িত্ব নিয়েছে জেলা প্রশাসন। প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে আর্থিক সহায়তা। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নাজমার হাতে সহায়তার অর্থ তুলে দেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম।
নাজমার আদিবাড়ি বিক্রমপুরের মজিদপুর গ্রামে। বর্তমানে ছোট বোন আছমার সঙ্গে রাজধানীর মগবাজারে থাকেন তিনি। জন্ম থেকেই বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হওয়ায় তার বিয়ে হয়নি। বাবা-মা ও ভাইয়ের মৃত্যুর পর বড় বোনের দেখাশোনার পুরো দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন আছমা। কিন্তু সীমিত আয়ের সংসারে নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি বোনের চিকিৎসা ও দৈনন্দিন খরচ চালানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু ওষুধ কিনতেই প্রতি মাসে তিন থেকে চার হাজার টাকা প্রয়োজন হয় নাজমার। আছমা আক্তার বলেন, ‘আমি ছাড়া আমার বোনের দেখাশোনা করার মতো আর কেউ নেই। একটি অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক ম্যাডামের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছিল। তিনি নিজেই আমার বোনকে দেখে তার অবস্থা সম্পর্কে জানতে চান। পরে তাকে নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যেতে বলেন। তার কথামতো যাওয়ার পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা সহায়তা পেয়েছি। আজও সেই সহায়তা নিতে এসেছি। সহায়তার অর্থ কীভাবে কাজে আসছে, তা জানাতে গিয়ে আছমা বলেন, ‘এই টাকা দিয়ে বোনের চিকিৎসা করাতে পারছি। প্রতি মাসে তিন থেকে চার হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়। এখন তাকে ভালো খাবার, ফলমূল, মাছ-মাংস কিনে দিতে পারছি। আগে সবকিছু সামলাতে অনেক কষ্ট হতো। সরকারের এ সহযোগিতায় আমরা সত্যিই অনেক আনন্দিত।’
জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম জানান, তিন-চার মাস আগে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে ‘মায়ার বাঁধন’ নামে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে নাজমার সঙ্গে পরিচয় হয়। তখনই নাজমার জীবনসংগ্রাম ও অসহায়ত্বের কথা জানতে পারেন তিনি। ফরিদা খানম বলেন, ‘নাজমার বয়স ৬৫ বছর। ছোটবেলা থেকেই তিনি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। বাবা-মা ও ভাই কেউ বেঁচে নেই, বিয়েও হয়নি। বর্তমানে ছোট বোনই তাকে দেখাশোনা করছেন। কিন্তু বোনেরও সীমিত আয়। ফলে নাজমার চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছিল। বিষয়টি জানার পর ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। তিনি আরও বলেন, ‘নাজমার চিকিৎসা, ওষুধপত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ইনশাআল্লাহ, প্রতি মাসেই এ সহায়তা অব্যাহত থাকবে। জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমাদের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত। তারপরও সমাজের অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদেরও এ ধরনের মানুষের পাশে এগিয়ে আসা উচিত। সবার সম্মিলিত উদ্যোগে অসহায় মানুষের জীবন কিছুটা হলেও সহজ ও মর্যাদাপূর্ণ করা সম্ভব। নাজমার জীবনের সব সংকট হয়তো এ সহায়তায় দূর হবে না। তবে নিয়মিত ওষুধ কেনা, চিকিৎসা করানো এবং পছন্দমতো কিছু খাবার কিনে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে তার ছোট বোনের জন্য। দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের জীবনে এই সহযোগিতা তাই শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, দুই বোনের কাছে কিছুটা নিশ্চিন্তে বেঁচে থাকার আশাও।