জিএম মাকছুদুর রহমান, কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি:
প্রাচীন সভ্যতার গৌরবময় ইতিহাস, জিভে জল আনা মিষ্টির সুবাস, শত বছরের ঐতিহ্যবাহী খাদি কাপড় আর সুর-সাহিত্যের এক অপূর্ব মিলনমেলার নাম কুমিল্লা। প্রাচীনকাল থেকেই এই জনপদ তার নিজস্ব স্বকীয়তা ও ঐতিহ্যের কারণে দেশ-বিদেশে এক আলাদা স্থান করে নিয়েছে। কালের বিবর্তনে পৃথিবীর অনেক শহরের রূপ বদলালেও কুমিল্লা তার হাজার বছরের ঐতিহ্যকে বুকে আগলে ধরে আজও সগৌরবে টিকে আছে। কুমিল্লার কথা উঠলেই সবার আগে চোখের সামনে ভেসে ওঠে এর মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার অনন্য নিদর্শন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ময়নামতি ও লালমাই পাহাড়ের শালবন বিহার। এছাড়াও কুটিলা মুড়া, রূপবান মুড়া এবং চারপত্র মুড়ার মতো প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো প্রাচীন বাংলার স্থাপত্যশৈলী ও সমৃদ্ধির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। শহরের ঠিক কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত সুবিশাল দীঘি ‘ধর্মসাগর’ যেন এই শহরের এক শান্ত ও শীতল প্রাণকেন্দ্র, যা ত্রিপুরার মহারাজা ধর্মমাণিক্যের জনকল্যাণমূলক কাজের এক ঐতিহাসিক স্মারক। এর পাশাপাশি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ হারানো সৈনিকদের স্মৃতিবিজড়িত ‘ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি’র শান্ত, সবুজ ও স্নিগ্ধ পরিবেশ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের এক অন্যরকম আবেগ ও বিষাদময় ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড় করায়। তবে কুমিল্লার খ্যাতি শুধু প্রাচীন নিদর্শনেই সীমাবদ্ধ নয়, ভোজনরসিকদের কাছে এই শহরের নাম শুনলেই জিভে জল চলে আসে। আর তার একমাত্র কারণ হলো কুমিল্লার বিশ্ববিখ্যাত রসমালাই। বিশেষ করে শহরের মনোহরপুরের ঐতিহ্যবাহী ‘মাতৃভাণ্ডার’ এর আসল রসমালাইয়ের স্বাদ নিতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন। ঘন ক্ষীর আর ছোট ছোট নরম রসগোল্লার এই যুগলবন্দি কুমিল্লার আতিথেয়তার এক অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে। পোশাক ও কুটির শিল্পের ক্ষেত্রেও কুমিল্লার অবদান অনন্য। ব্রিটিশবিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের সময় মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে যখন বিদেশি বস্ত্র বর্জনের ডাক দেওয়া হয়, তখন কুমিল্লায় খাদি বা খদ্দর শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। সম্পূর্ণ হাতে বোনা, আরামদায়ক ও শতভাগ সুতি খাদি কাপড় আজ শুধু দেশের বুকেই জনপ্রিয় নয়, বরং এর নান্দনিক ডিজাইন ও গুণগত মানের কারণে এটি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন জগতেও নিজের জায়গা করে নিয়েছে। শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কুমিল্লাকে অনায়াসে বাংলাদেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক রাজধানী বলা যায়। এই শহরের ধূলিকণায় মিশে আছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রেম ও দ্রোহের স্মৃতি। সুরের জাদুকর শচীন দেব বর্মণ কিংবা সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ-র মতো কালজয়ী সংগীতসাধকদের সুরের ধারা আজও কুমিল্লার বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়। সব মিলিয়ে ইতিহাস, ঐতিহ্য, খাদ্যাভ্যাস আর সংস্কৃতির এক অপরূপ সংমিশ্রণ ঘটেছে এই কুমিল্লায়। বর্তমান যুগের আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়েও শহরটি তার প্রাচীন ঐতিহ্যকে যেভাবে টিকিয়ে রেখেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সঠিক প্রচার ও সরকারি-বেসরকারি আরও বেশি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে কুমিল্লার এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে আরও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।