Dhaka ১০:১৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ
“জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬” উপলক্ষে নেত্রকোণায় গভীর শ্রদ্ধা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে স্বর্ণবার বেনাপোল দিয়ে ভারতে পাচারের সময় কাস্টম থেকে আটক ১ পাসপোর্টধারী জুলাই থেকে গণঅভ্যুত্থান বদলে যাওয়া বাংলাদেশের ইতিহাসের মোড় মান্দায় যথাযোগ্য মর্যাদায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালিত শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা চিলমারীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬ পালিত মান্দায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে জামায়াতের গণমিছিল ও সমাবেশ চট্টগ্রামে ঐতিহাসিক ফ্যাসিবাদ বিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উদযাপন আটোয়ারীতে সন্ধ্যা নামলেও নামেনি জাতীয় পতাকা, ২৬ নং গোবিন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবহেলা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে শাজাহানপুরে ছাত্রশিবিরের বিক্ষোভ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য: প্রধানমন্ত্রী

হাওর সংস্কৃতির স্মারক নাওমহাল

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃ বর্ষা এলেই সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বাড়ে নৌকার কদর। হাওরের জলপথে সচল থাকা, মাছ ধরা, নিত্যপণ্য পরিবহন কিংবা বিয়ের শোভাযাত্রা সবকিছুতেই প্রাত্যহিক জীবনের প্রধান অনুষঙ্গ নৌকা। আর এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান ক্রয়কেন্দ্র হয়ে উঠেছে মধ্যনগর বাজারের ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী নৌকার হাট, যা স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘নাওমহাল’ নামে। বর্ষার টইটম্বুর পানিতে হাওরের বুকজুড়ে যখন ঢেউ খেলে যায়, তখন এই ভাসমান নাওমহালে আবর্তিত হয় জীবনের ভিন্ন এক গল্প। এটি কেবল পণ্যের কেনাবেচার স্থান নয়; বরং হাওরবাসীর সংস্কৃতি, সংগ্রাম আর টিকে থাকার লড়াইয়ের এক অনন্য স্মারক। প্রতি শনিবার মধ্যনগর বাজারের কাচারীঘাটঘেঁষা গোরাডোবা হাওরে বসে এই ভাসমান হাট। সকাল থেকেই সারিবদ্ধভাবে বেঁধে রাখা নৌকা, দরদাম আর হাঁকডাকে হাটজুড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ। দুপুর পর্যন্ত চলে এই কেনাবেচা। হাটে খিলুয়া, কুশি, সরঙ্গা, চাচতলী, চডানাউ, বারকিসহ নানা কারুকাজের নৌকা পাওয়া যায়। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, এই হাটের ইতিহাস প্রায় এক শতাব্দীর পুরোনো। ১৯২০ সালের দিকে গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় মধ্যনগরে একটি দিঘি খনন করালে তার পাশেই গড়ে ওঠে স্থায়ী বাজার ও নৌকার হাট। সেই থেকে আজও স্বমহিমায় টিকে রয়েছে ‘নাওমহাল’। কেবল মধ্যনগরই নয়; পার্শ্ববর্তী তাহিরপুর, ধর্মপাশা এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও বারহাট্টা থেকেও ক্রেতা-বিক্রেতারা এখানে সমবেত হন। মধ্যনগর বিশ্বেশ্বরী পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সহকারী শিক্ষক এবং উপজেলা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. আল আমীন বলেন, মেহগনি, কড়ই ও চাম্বল কাঠে তৈরি এসব নৌকা আকারভেদে ৫ থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।

আরও পড়ুনঃ  ‎গণঅভ্যুত্থান দিবস ও সাপ্তাহিক ছুটি উপলক্ষে গাজীপুরে মহাসড়কে তীব্র যানজট

 

ইজারাদারদের ভাষ্যমতে, হাটে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে নৌকা কেনাবেচা করেন, যা থেকে সরকার প্রতি বছর বড় অঙ্কের রাজস্ব পায়। তবে স্থান স্বল্পতার কারণে হাটে নৌকা রাখা ও বাঁধতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নৌকার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা বা ঘাট প্রসারণে সরকার গুরুত্ব দিলে ভবিষ্যতে এই হাট থেকে রাজস্ব আদায় আরও বহু গুণ বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। এই হাটের ওপর নির্ভর করে বেঁচে রয়েছে এলাকার শত শত নৌকা কারিগরের সংসার। বর্ষা মৌসুম শুরুর দু-তিন মাস আগে থেকেই দিনরাত কাঠ চেরা, তক্তা জোড়া লাগানো আর আলকাতরা দেওয়ার কাজে ব্যস্ত থাকেন তারা। স্থানীয় প্রবীণ নৌকার কারিগর হরেন্দ্র বিশ্বাস বলেন, কাঠ-পেরেকসহ সব ধরনের উপকরণের দাম আগের চেয়ে বেড়েছে। তারপরও বাপ-দাদার পেশা আর ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতি মৌসুমেই আমরা নতুন নৌকা তৈরি করি। মধ্যনগরের এই ঐতিহ্যবাহী হাটে চাহিদা ভালো থাকায় আমরা ন্যায্য মূল্য পাই, যা দিয়ে সারা বছর সংসার চলে। অন্যদিকে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতাদের ভিড়ে জমজমাট থাকে পুরো হাওর প্রাঙ্গণ। নেত্রকোনার কলমাকান্দা থেকে আসা ক্রেতা রফিকুল ইসলাম জানান, হাওরাঞ্চলে বর্ষাকালে যাতায়াত কিংবা পণ্য পরিবহনের জন্য নৌকার কোনো বিকল্প নেই। মধ্যনগরের নাওমহালে এসে একসঙ্গে বিভিন্ন কাঠ ও ডিজাইনের নৌকা দেখে দরদাম করে কেনার সুযোগ পাওয়া যায়। হাওরের চিরন্তন এই জীবনচিত্র নিয়ে মধ্যনগরের ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনি রায় বলেন, ‘ছয় মাস নাও, ছয় মাস পাও’—এটাই হাওরাঞ্চলের চিরন্তন বাস্তবতা। শতবর্ষী এই নৌকার হাট হাওরবাসীর জীবনযাত্রারই প্রতিচ্ছবি। হাটের সার্বিক নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও ঐতিহ্য রক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আরও পড়ুনঃ  ভাঙ্গুড়ায় অষ্টমনিষা ইউনিয়ন বিএনপির দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত
Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

“জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬” উপলক্ষে নেত্রকোণায় গভীর শ্রদ্ধা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে নানা কর্মসূচি পালিত হয়েছে

হাওর সংস্কৃতির স্মারক নাওমহাল

আপডেটের সময়: ০৫:২৫:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিঃ বর্ষা এলেই সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বাড়ে নৌকার কদর। হাওরের জলপথে সচল থাকা, মাছ ধরা, নিত্যপণ্য পরিবহন কিংবা বিয়ের শোভাযাত্রা সবকিছুতেই প্রাত্যহিক জীবনের প্রধান অনুষঙ্গ নৌকা। আর এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান ক্রয়কেন্দ্র হয়ে উঠেছে মধ্যনগর বাজারের ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী নৌকার হাট, যা স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘নাওমহাল’ নামে। বর্ষার টইটম্বুর পানিতে হাওরের বুকজুড়ে যখন ঢেউ খেলে যায়, তখন এই ভাসমান নাওমহালে আবর্তিত হয় জীবনের ভিন্ন এক গল্প। এটি কেবল পণ্যের কেনাবেচার স্থান নয়; বরং হাওরবাসীর সংস্কৃতি, সংগ্রাম আর টিকে থাকার লড়াইয়ের এক অনন্য স্মারক। প্রতি শনিবার মধ্যনগর বাজারের কাচারীঘাটঘেঁষা গোরাডোবা হাওরে বসে এই ভাসমান হাট। সকাল থেকেই সারিবদ্ধভাবে বেঁধে রাখা নৌকা, দরদাম আর হাঁকডাকে হাটজুড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ। দুপুর পর্যন্ত চলে এই কেনাবেচা। হাটে খিলুয়া, কুশি, সরঙ্গা, চাচতলী, চডানাউ, বারকিসহ নানা কারুকাজের নৌকা পাওয়া যায়। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, এই হাটের ইতিহাস প্রায় এক শতাব্দীর পুরোনো। ১৯২০ সালের দিকে গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় মধ্যনগরে একটি দিঘি খনন করালে তার পাশেই গড়ে ওঠে স্থায়ী বাজার ও নৌকার হাট। সেই থেকে আজও স্বমহিমায় টিকে রয়েছে ‘নাওমহাল’। কেবল মধ্যনগরই নয়; পার্শ্ববর্তী তাহিরপুর, ধর্মপাশা এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও বারহাট্টা থেকেও ক্রেতা-বিক্রেতারা এখানে সমবেত হন। মধ্যনগর বিশ্বেশ্বরী পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সহকারী শিক্ষক এবং উপজেলা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. আল আমীন বলেন, মেহগনি, কড়ই ও চাম্বল কাঠে তৈরি এসব নৌকা আকারভেদে ৫ থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।

আরও পড়ুনঃ  ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য: প্রধানমন্ত্রী

 

ইজারাদারদের ভাষ্যমতে, হাটে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে নৌকা কেনাবেচা করেন, যা থেকে সরকার প্রতি বছর বড় অঙ্কের রাজস্ব পায়। তবে স্থান স্বল্পতার কারণে হাটে নৌকা রাখা ও বাঁধতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নৌকার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা বা ঘাট প্রসারণে সরকার গুরুত্ব দিলে ভবিষ্যতে এই হাট থেকে রাজস্ব আদায় আরও বহু গুণ বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। এই হাটের ওপর নির্ভর করে বেঁচে রয়েছে এলাকার শত শত নৌকা কারিগরের সংসার। বর্ষা মৌসুম শুরুর দু-তিন মাস আগে থেকেই দিনরাত কাঠ চেরা, তক্তা জোড়া লাগানো আর আলকাতরা দেওয়ার কাজে ব্যস্ত থাকেন তারা। স্থানীয় প্রবীণ নৌকার কারিগর হরেন্দ্র বিশ্বাস বলেন, কাঠ-পেরেকসহ সব ধরনের উপকরণের দাম আগের চেয়ে বেড়েছে। তারপরও বাপ-দাদার পেশা আর ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতি মৌসুমেই আমরা নতুন নৌকা তৈরি করি। মধ্যনগরের এই ঐতিহ্যবাহী হাটে চাহিদা ভালো থাকায় আমরা ন্যায্য মূল্য পাই, যা দিয়ে সারা বছর সংসার চলে। অন্যদিকে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতাদের ভিড়ে জমজমাট থাকে পুরো হাওর প্রাঙ্গণ। নেত্রকোনার কলমাকান্দা থেকে আসা ক্রেতা রফিকুল ইসলাম জানান, হাওরাঞ্চলে বর্ষাকালে যাতায়াত কিংবা পণ্য পরিবহনের জন্য নৌকার কোনো বিকল্প নেই। মধ্যনগরের নাওমহালে এসে একসঙ্গে বিভিন্ন কাঠ ও ডিজাইনের নৌকা দেখে দরদাম করে কেনার সুযোগ পাওয়া যায়। হাওরের চিরন্তন এই জীবনচিত্র নিয়ে মধ্যনগরের ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জনি রায় বলেন, ‘ছয় মাস নাও, ছয় মাস পাও’—এটাই হাওরাঞ্চলের চিরন্তন বাস্তবতা। শতবর্ষী এই নৌকার হাট হাওরবাসীর জীবনযাত্রারই প্রতিচ্ছবি। হাটের সার্বিক নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও ঐতিহ্য রক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আরও পড়ুনঃ  চিলমারীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬ পালিত