
আহমেদ আক্তার রানা , কুলাউড়া উপজেলা প্রতিনিধি: বছরের পর বছর অচল জেনারেটর, রাতের রোগীদের ভরসা মোবাইলের টর্চ ও হাতপাখা; ১০টি ব্যাকআপ লাইট নিয়ে পাশে টিম জার্নালিস্ট’স মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ৫০ শয্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। দিনের বেলায় পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া গেলেও রাতের বেলায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিলে রোগী ও স্বজনদের পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে। ওয়ার্ডে আলো না থাকায় কোথাও মোবাইল ফোনের টর্চ, কোথাও হাতপাখা—এভাবেই সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে তাঁদের। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের পুরোনো জেনারেটরটি দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে আছে। সেটি মেরামত করে চালু করার মতো অবস্থায় নেই। অন্যদিকে, পুরো হাসপাতালের বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখার মতো কার্যকর কোনো কেন্দ্রীয় বিকল্প ব্যবস্থাও নেই। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে হাসপাতালের স্বাভাবিক পরিবেশ ও রোগীদের দুর্ভোগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দেয়।
মৌলভীবাজারের সীমান্তবর্তী উপজেলা কুলাউড়ার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এখানে চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক রোগী পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সী মানুষ ভর্তি থেকে চিকিৎসা নেন। হাসপাতালে রয়েছে বিভিন্ন ওয়ার্ডের পাশাপাশি আইসোলেশন ইউনিট। সেখানে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। ফলে হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডে সার্বক্ষণিক আলো-বাতাস ও প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকা রোগীদের স্বাভাবিক চিকিৎসা পরিবেশের জন্য কিন্তু হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে বিশেষ করে রাতের বেলায় সমস্যাটি প্রকট আকার ধারণ করে। অন্ধকার ও গরমের মধ্যে রোগীরা যেমন অস্বস্তিতে পড়েন, তেমনি তাঁদের স্বজনদেরও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। একাধিক রোগীর স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর অনেক সময় মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে রোগীর পাশে থাকতে হয়। আবার গরমের সময় বিদ্যুৎ না থাকলে হাতপাখা দিয়ে রোগীকে বাতাস করতে হয়। এতে রোগীর স্বজনদের পাশাপাশি অসুস্থ রোগীদেরও দুর্ভোগ বাড়ে। এক রোগীর স্বজন বলেন, “রোগীকে নিয়ে হাসপাতালে এসে যদি বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর আলো ও বাতাসের জন্য মোবাইলের টর্চ আর হাতপাখার ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে বিষয়টি খুবই কষ্টের।
এখানে জরুরি বিদ্যুতের একটি স্থায়ী ব্যবস্থা থাকা দরকার। আজ বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) হাসপাতাল সূত্রে জানা যায় , হাসপাতালের পুরোনো জেনারেটরটি দীর্ঘদিন ধরে অচল। বর্তমানে সেটি মেরামত করে পুনরায় চালু করা সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে হাসপাতালের সব গুরুত্বপূর্ণ অংশে একসঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার মতো কার্যকর কেন্দ্রীয় ব্যাকআপ ব্যবস্থাও নেই। ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে রোগী, স্বজন ও হাসপাতালের কর্মীদেরই পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। বিশেষ করে রাতের বেলায় এ সমস্যা আরও বেশি অনুভূত হয়। স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি সরকারি ৫০ শয্যার হাসপাতালে যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন, সেখানে জরুরি মুহূর্তে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য আধুনিক বিকল্প ব্যবস্থা কেন দীর্ঘদিন ধরে স্থাপন করা হয়নি? হাসপাতালের বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধান না হলেও রোগীদের তাৎক্ষণিক দুর্ভোগ কিছুটা কমাতে এগিয়ে এসেছে সাংবাদিক সদস্যদের সংগঠন টিম জার্নালিস্ট’স কুলাউড়া। সংগঠনটির উদ্যোগে হাসপাতালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থাপন করা হয়েছে ১০টি ব্যাকআপ লাইট। বিদ্যুৎ চলে গেলে এসব লাইটের আলোয় রোগী ও তাঁদের স্বজনরা সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন।
টিম জার্নালিস্ট’সের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনরা। তাঁদের মতে, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সময় অন্তত ওয়ার্ডে আলো থাকার কারণে রোগীর প্রয়োজনীয় কাজগুলো কিছুটা সহজ হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সামাজিক সংগঠন বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেওয়া কয়েকটি ব্যাকআপ লাইট দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। এগুলো সাময়িকভাবে অন্ধকার কমাতে পারে, কিন্তু হাসপাতালের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন একটি নিরবচ্ছিন্ন ও পূর্ণাঙ্গ জরুরি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা। কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা উৎফল দাশ বলেন, “হাসপাতালের পুরোনো জেনারেটরটি দীর্ঘদিন ধরে অচল। এটি মেরামত করে চালু করা সম্ভব নয়। বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, উপজেলা প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। তিনি জানান, হাসপাতালের বিদ্যুৎ সমস্যার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও রোগীদের স্বজনদের দাবি, কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিদ্যুৎ সমস্যাকে আর সাময়িকভাবে দেখার সুযোগ নেই। দ্রুত একটি নতুন জেনারেটর স্থাপনের পাশাপাশি হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ
ওয়ার্ডগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আধুনিক বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, বিদ্যুৎ চলে গেলে একটি সরকারি হাসপাতালে রোগীকে মোবাইলের টর্চ কিংবা হাতপাখার ওপর নির্ভর করতে হওয়া শুধু দুর্ভোগের বিষয় নয়—এটি হাসপাতালের জরুরি অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে। টিম জার্নালিস্ট’স কুলাউড়ার দেওয়া ১০টি ব্যাকআপ লাইট আপাতত রোগীদের অন্ধকার থেকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও ৫০ শয্যার এই হাসপাতালের দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে নতুন জেনারেটর কিংবা আধুনিক পূর্ণাঙ্গ বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করবে—যাতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময়ও কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রাখা যায়।
প্রতিবেদকের নাম 


















