তৌহিদ-উল বারী, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
চুড়ি শুধু একটি অলংকার নয়, বরং অনেক নারীর আবেগ, ভালোবাসা আর সৌন্দর্য প্রকাশের অন্যতম অনুষঙ্গ। প্রিয়জনের দেওয়া এক জোড়া চুড়ি যেমন মুহূর্তেই অভিমান ভাঙিয়ে দিতে পারে, তেমনি সেই চুড়িই একজন নারীর স্বপ্নপূরণের মাধ্যমও হতে পারে। এমনই এক অনুপ্রেরণার নাম মেহেরিন মিশু। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পশ্চিম চাম্বল বাংলা বাজার এলাকার বাসিন্দা মেহেরিন মিশু। বাবা-মায়ের দুই ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে তিনি চতুর্থ সন্তান। ছোটবেলা থেকেই সৃজনশীল কাজের প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ। সেই আগ্রহ থেকেই একসময় হাতে তৈরি চুড়ি বানানোর যাত্রা শুরু। মাত্র এক হাজার টাকার উপকরণ কিনে শখের বসে প্রথম চুড়ি তৈরি করেন তিনি। নিজের হাতে বানানো সেই প্রথম জোড়া চুড়ি বড় বোনকে দেখালে প্রশংসা পান। বড় বোনের সেই একটি উৎসাহব্যঞ্জক মন্তব্যই যেন তাঁর আত্মবিশ্বাসের ভিত গড়ে দেয়। পরে বন্ধুদের দেখালে তারাও দারুণ উৎসাহ দেন এবং প্রথম ক্রেতা হিসেবে চুড়ির অর্ডারও করেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বিভিন্ন অনলাইন পেজের ডিজাইন দেখে নিজের সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তি দিয়ে নতুন নতুন নকশার চুড়ি তৈরি করতে থাকেন মিশু। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নয়- শুধু শেখার আগ্রহ, ধৈর্য এবং নিরলস চেষ্টাই তাঁকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
নিজের উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে পৌঁছে দিতে একটি ফেসবুক পেজ চালু করেন তিনি। বর্তমানে অফলাইন ও অনলাইন- দুই মাধ্যমেই তাঁর হাতে তৈরি চুড়ির ভালো চাহিদা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নিয়মিত অর্ডার পাচ্ছেন তিনি, আর ক্রেতাদের ইতিবাচক সাড়া তাঁকে প্রতিনিয়ত নতুন উদ্যমে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগায়। তবে হাতে তৈরি চুড়ির দাম নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। এ বিষয়ে মিশু বলেন, এক সেট চুড়ি তৈরি করতে প্রায় সাত থেকে আট ঘণ্টা সময় লাগে। প্রতিটি পাথর, মুক্তা ও অলংকার অত্যন্ত যত্ন নিয়ে বসাতে হয়। নিখুঁত ফিনিশিং নিশ্চিত করতে অনেক ধৈর্য ও শ্রম দিতে হয়। তাই একটি হ্যান্ডমেড চুড়ির মূল্য শুধু উপকরণের নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন কারিগরের সময়, মেধা, ভালোবাসা ও পরিশ্রম। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিটি নারীরই নিজের একটি পরিচয় থাকা উচিত। তাঁর ভাষায়, ঘরে বসেই যদি নিজের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে কিছু করা যায়, তাহলে একজন নারী শুধু নিজের স্বপ্নই পূরণ করেন না, বরং পরিবারের আর্থিক শক্তি হয়ে উঠতে পারেন। মেহেরিন মিশুর এই পথচলা শুধু একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সফলতার গল্প নয়; এটি অসংখ্য তরুণী ও গৃহিণীর জন্য সাহস ও অনুপ্রেরণার বার্তা। সীমিত পুঁজি, অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং কঠোর পরিশ্রম থাকলে যে কোনো স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে পারে- তারই উজ্জ্বল উদাহরণ তিনি।
নিজের কাজের প্রতি ভালোবাসাই তাঁকে আজ একজন পরিচিত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তায় পরিণত করেছে। প্রতিটি সফল ডেলিভারি এবং ক্রেতার হাসিমুখ তাঁকে আরও নতুনভাবে কাজ করার অনুপ্রেরণা দেয়। স্বপ্ন দেখতে জানলে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলস পরিশ্রম করলে সাফল্য একদিন ধরা দিতেই পারে। বাঁশখালীর মেহেরিন মিশুর গল্প সেই সত্যকেই আবারও নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। শখ থেকে শুরু হওয়া ছোট্ট একটি উদ্যোগ আজ অনেক নারীর জন্য অনুপ্রেরণার নাম। মেহেরিন মিশুর এই সাফল্যের গল্প প্রমাণ করে- ইচ্ছাশক্তি, ধৈর্য আর পরিশ্রম থাকলে ছোট একটি স্বপ্নও একদিন বড় সাফল্যে রূপ নিতে পারে।