নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজধানীর নীলক্ষেতের মামা হোটেল। দুপুর থেকে রাত ১টা পর্যন্ত এখানে ভিড় লেগেই থাকে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে তাই কিছুটা বিড়ম্বনায় পড়তে হয় হোটেল মালিককে। তাই বাধ্য হয়ে জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়। যাতে বিদ্যুৎ চলে গেলেও কিছুটা সময় লাইট-ফ্যানের ব্যবস্থা করা যায়। হোটেলের মালিক সুজন বলেন, জেনারেটর ব্যাকাপের জন্য রাখি। আগে তো লাগতই না। এখন হুট করে বিদ্যুৎ চলে যায়, তাই জেনারেটরে সবসময় তেল রাখি। দোকানের লাইট-ফ্যান সবসময় চালু রাখতে হয়। কাস্টমার গরমে বসে খেতে পারে না। এমন চিত্র শুধু নীলক্ষেতের এই হোটেল নয়, লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলেই চালু করতে হচ্ছে জেনারেটর। দোকানপাট থেকে শুরু করে হোটেল-রেস্টুরেন্ট, মার্কেট, অফিস, বাণিজ্যিক ভবন এমনকি বাসাবাড়িতেও বেড়েছে জেনারেটরের ব্যবহার। এতে বিদ্যুৎ না থাকার ভোগান্তির পাশাপাশি বাড়ছে জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়। গত কয়েকদিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে দেখা গেছে, দিনের বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ চলে গেলে সঙ্গে সঙ্গে জেনারেটর চালু করা হচ্ছে। ছোট দোকানে ব্যবহার করা হচ্ছে ছোট আকারের জেনারেটর। বড় মার্কেট, ভবন ও প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা হচ্ছে ডিজেলচালিত জেনারেটর।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগে তেমন বিদ্যুৎ যেত না। মাঝে-মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলেও জেনারেটর চালানোর প্রয়োজন হতো সীমিত সময়ের জন্য। ব্যাকাপ হিসেবে রাখা হতো। কিন্তু বর্তমানে লোডশেডিংয়ের সময় বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় জেনারেটর চালিয়ে রাখতে হচ্ছে। ফলে ব্যবসার স্বাভাবিক খরচের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়। মালিবাগের দোকানদার রমিজ খান বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে দোকানের ফ্যান, লাইট, ফ্রিজসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি চালানো যায় না। ক্রেতাদেরও অসুবিধা হয়। তাই বাধ্য হয়ে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে প্রতিদিন আলাদা করে জ্বালানি তেল কিনতে হচ্ছে। লোডশেডিং বাড়লে এই খরচও বাড়ে। হোটেল ও রেস্টুরেন্টগুলোতেও একই পরিস্থিতি। খাবার সংরক্ষণের জন্য ফ্রিজ ও ফ্রিজার চালু রাখা জরুরি। পাসাপাশি রান্নাঘর, বসার জায়গা ও কাউন্টারে আলো-ফ্যান সচল রাখতে হয়। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক প্রতিষ্ঠানই জেনারেটর চালু করছে। দীর্ঘ সময় জেনারেটর চালানোর কারণে জ্বালানি খরচ বাড়ছে। বাণিজ্যিক ভবনগুলোতেও জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে আলো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কম্পিউটার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা সচল রাখতে জেনারেটর চালু করতে হচ্ছে। কোনো কোনো ভবনে দিনে একাধিকবার জেনারেটর চালানোর প্রয়োজন হচ্ছে।
বাসাবাড়িতেও ছোট জেনারেটরের ব্যবহার বাড়ছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্যান, লাইট, রাউটার, টেলিভিশনসহ জরুরি কিছু বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালু রাখতে অনেক পরিবার জেনারেটর ব্যবহার করছে। এতে পরিবারের মাসিক খরচেও নতুন করে যুক্ত হচ্ছে জ্বালানি ব্যয়। মগবাজারের বাসিন্দা আশিক রহমান বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালু করতে হয়। এজন্য আলাদা করে বিল দিতে হয়। বিদ্যুৎ না গেলে জেনারেটর চালানের প্রয়োজন হয়না, তাই বিলও দিতে হয় না। জেনারেটরের ধরন ও লোডের ওপর নির্ভর করে প্রতি ঘণ্টায় জ্বালানি খরচের পরিমাণ ভিন্ন হয়। শুধু জ্বালানি নয়, নিয়মিত জেনারেটর চালানোর কারণে ইঞ্জিন অয়েল পরিবর্তন, ফিল্টার পরিষ্কার- পরিবর্তন, সার্ভিসিং এবং যন্ত্রাংশের ক্ষয়জনিত খরচও বাড়ছে। ফলে লোডশেডিংয়ের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তৈরি হচ্ছে নতুন আর্থিক চাপ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার পরও বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটরের জন্য আলাদা অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। অর্থাৎ একই ব্যবসা সচল রাখতে বিদ্যুৎ সরবরাহের খরচের পাশাপাশি বিকল্প বিদ্যুতের খরচও বহন করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ছোট দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এই বাড়তি ব্যয় সামলানো কঠিন হয় পড়ছে।
জ্বালানি ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাও বলছেন, জেনারেটরের ব্যবহার বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই ডিজেল ও পেট্রোলের চাহিদা বাড়ে। সম্প্রতি লোডশেডিংয়ের সঙ্গে জেনারেটর চালানোর প্রবণতা বাড়ায় ডিজেলের চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টিও সামনে এসেছে। বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল জাগো নিউজকে বলেন, লোডশেডিং থাকায় জেনারেটরের চাহিদা বেড়েছে। বেশি সময় ধরে জেনারেটর চালিয়ে রাখতে হচ্ছে। এতে তেল খরচ বেড়েছে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ডিজেলের চাহিদা বেড়েছে অনেক। তিনি বলেন, আমরা চাহিদা মতো ডিজেল সরবরাহ করতে পারছি না। ডিজেলের চাহিদা এখন অনেক। বিশেষ করে ইন্ডাস্ট্রিয়াল এালাকাতে অনেক চাহিদা। এক একটি কোম্পানি ছোট ছোট ট্রাক এনে ৮-১০ ব্যারেল ডিজেল নিয়ে যাচ্ছে। আমরা চাহিদা মতো দিতে পারছি না। তিনি আরও বলেন, ডিজেলের চাহিদা বেড়েছে কিন্তু সরবরাহ আগের মতোই আছে। আমাদের গাড়ি যাচ্ছে তেল আনতে, গাড়ির ধারণ ক্ষমতা ১৮ হাজার লিটার, কিন্তু আমাদের দেওয়া হচ্ছে ৯ হাজার লিটার। আমরা চাহিদা পূরণ করতে পারছি না।