এম. আজাদ খান, স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া: একসময় দেয়ালজুড়ে ছিল পোস্টার, ব্যানার, বিজ্ঞাপন আর অননুমোদিত দেয়ালিকার দখল। সেই বিবর্ণ কংক্রিটের দেয়ালেই এখন রঙের তুলিতে জীবন্ত হয়ে উঠছে বগুড়ার হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতি। মহাস্থানগড়, বেহুলার বাসরঘর, বৈরাগীর ভিটা, জিয়ত কুণ্ডু থেকে শুরু করে বগুড়ার বিখ্যাত দই, আলু ও লাল মরিচ—সবই স্থান পাচ্ছে দৃষ্টিনন্দন ম্যুরালে। কংক্রিটের দেয়াল যেন পরিণত হচ্ছে উন্মুক্ত শিল্পগ্যালারিতে। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেলে বগুড়া মহানগরীর বারোপুর ওভারপাসের দেয়ালে চলমান এই ব্যতিক্রমী চিত্রকর্ম পরিদর্শন করেন বগুড়া-৬ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা। পরিদর্শনকালে তিনি চিত্রকর্মে বগুড়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও স্থানীয় সংস্কৃতির পাশাপাশি জেলার জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃত বগুড়ার দই, বিশেষ করে নবাবী দইয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী পণ্যগুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরার পরামর্শ দেন। রেজাউল করিম বাদশা বলেন, বগুড়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই এ উদ্যোগের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। চিত্রকর্মের মাধ্যমে ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা অত্যন্ত শিক্ষণীয় বিষয়। এটি সবার ভালো লাগবে এবং নতুন প্রজন্ম নিজেদের এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারবে।
বগুড়া সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চারলেন জাতীয় মহাসড়কের বগুড়া মহানগর অংশে একটি রেল ওভারপাস ও দুটি ওভারপাস রয়েছে। এর মধ্যে বারোপুর ওভারপাসের উত্তর-পূর্ব দিকের দেয়ালে অ্যাক্রেলিক রঙে আঁকা হচ্ছে একের পর এক দৃষ্টিনন্দন চিত্রকর্ম। এসব চিত্রে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে বগুড়ার গৌরবময় অতীত, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, লোককথা, কৃষি ও খাদ্যসংস্কৃতি। চিত্রকর্মগুলোতে স্থান পেয়েছে প্রাচীন পুণ্ড্রনগর ও মহাস্থানগড়, বেহুলার বাসরঘর, বৈরাগীর ভিটা, জিয়ত কুণ্ডু, বগুড়ার দই, আলু, লাল মরিচ, লাঙল দিয়ে হালচাষসহ এ অঞ্চলের ইতিহাস ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার নানা অনুষঙ্গ। প্রতিটি ছবিতে তুলে ধরা হচ্ছে এই জনপদের স্বতন্ত্র পরিচয়। এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বগুড়া বিয়াম মডেল স্কুল ও কলেজের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক ও ডিজিটাল আর্টিস্ট মো. আবু লায়েছ নিক্সন। তাঁর নেতৃত্বে শিল্পীরা বড় পরিসরে এসব ম্যুরাল আঁকার কাজ করছেন। আবু লায়েছ নিক্সন জানান, বগুড়া মহানগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি চিত্রকর্মের মাধ্যমে এ অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্প ও সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য। দেয়ালের প্রতিটি চিত্রের মাধ্যমে বগুড়ার স্বতন্ত্র পরিচয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। বগুড়া সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদুল হক জানান, ফ্লাইওভারের দেয়ালে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পোস্টার, ব্যানার ও বিজ্ঞাপন লাগানোর কারণে নগরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছিল। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কার্যক্রম নিরুৎসাহিত করা এবং শহরের নান্দনিক পরিবেশ বজায় রাখতেই বগুড়ার স্থানীয় পরিচয় তুলে ধরে ওয়াল আর্ট ও ম্যুরাল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ফ্লাইওভারের দেয়ালগুলো যেন কেবল কংক্রিটের অবকাঠামো হয়ে না থাকে, বরং বগুড়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির উন্মুক্ত শিল্পগ্যালারিতে পরিণত হয়, সেই লক্ষ্যেই সওজের এ উদ্যোগ। নির্বাহী প্রকৌশলী আরও জানান, বর্তমানে বারোপুর ওভারপাসের দেয়ালে পাইলট প্রকল্প হিসেবে কাজটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের অভিজ্ঞতা, ব্যয় ও সাফল্য বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে বগুড়ার অন্যান্য ওভারপাস, রেল ওভারপাস এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও এ ধরনের নান্দনিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। সওজ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে সাব-রিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন (সাসেক-২) প্রকল্পের আওতায় ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেনের সংস্থানসহ মহাসড়কটি উন্নীত করা হয়। ২০২৪ সালে শাজাহানপুর উপজেলার বি-ব্লক ক্যান্টনমেন্ট ওভারপাস, ফুলতলা ওভারপাস, ফটকি সেতু, বগুড়া সদরের তিনমাথা মোড়ের রেল ওভারপাস এবং বারোপুর ওভারপাস যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। অবকাঠামোগুলো চালুর পর থেকেই দেয়ালে পোস্টার, ব্যানার, বিজ্ঞাপন ও অননুমোদিত দেয়ালিকা লাগানোর প্রবণতা দেখা দেয়। এতে দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামোর সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের আগস্টে আন্দোলনের সময় এসব দেয়ালে জুলাইয়ের দাবি ও শহীদদের প্রতিকৃতি নিয়ে বিভিন্ন গ্রাফিতি আঁকা হলেও পরবর্তী সময়ে সেগুলোও পোস্টার ও দেয়ালিকার আড়ালে হারিয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে দেয়ালগুলো পরিচ্ছন্ন ও নান্দনিক রাখার পাশাপাশি বগুড়ার ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরতে সওজের এ উদ্যোগ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এ ধরনের শিল্পকর্ম শুধু নগরের সৌন্দর্যই বাড়াবে না, বরং স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় ঘটাবে এবং বগুড়ার ঐতিহ্যকে আরও বিস্তৃত পরিসরে তুলে ধরবে।