মোঃরাসেল বিষেশ প্রতিনিধি: কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার দুর্গম ও পাহাড়ি জনপদ বমু বিলছড়ি ইউনিয়নে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে চলমান সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে নজিরবিহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং যথাযথ প্রশাসনিক তদারকির অভাবকে পুঁজি করে কারিগরি নির্দেশিকা বা শিডিউলের তোয়াক্কা না করেই কোটি টাকার এই কাজ শেষ করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় বাসিন্দারা এই নিম্নমানের কাজের প্রতিবাদ জানালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) দায় এড়াতে দম্ভোক্তি করে বলেন আমাদের সাথে কথা বলে লাভ নেই, আপনাদের যা সমস্যা তা ইঞ্জিনিয়ারকে জানান এবং অফিসে গিয়ে জানান।" অন্যদিকে, দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা প্রকৌশলীর রহস্যজনক নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা এই দুর্নীতিতে তাদের পরোক্ষ যোগসাজশের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।সংশ্লিষ্ট সূত্র ও কাজের বিবরণী থেকে জানা যায়, এলজিইডির অধীনে ‘চট্টগ্রাম বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ (সিডিডব্লিউএসপি)’ প্রকল্পের আওতায় বমু বিলছড়ি ইউনিয়নের ফাঁদুখোলা-নন্দীরবিল সড়ক' এর শূন্য থেকে ২১৫০ মিটার (২.১৫ কিলোমিটার) রাস্তা প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণের কাজ চলছে।অভিযোগ উঠেছে, সড়কের মূল ভিত্তি বা মেকাডম তৈরিতে নিয়ম অনুযায়ী মানসম্মত ইটের খোয়া ব্যবহারের কথা থাকলেও, সেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যন্ত নিম্নমানের, নরম 'দুই থেকে তিন নম্বর' ইটের খোয়া। ভারী রোলার দিয়ে চাপ দেওয়ার সাথে সাথেই এই নরম খোয়াগুলো ভেঙে মাটিতে গুঁড়ো হয়ে মিশে যাচ্ছে।
শুধু তাই নয়, সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণে উন্নত মানের বালুর পরিবর্তে স্থানীয় নদী থেকে তোলা কাদাযুক্ত মিশ্রিত বালি ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়াও, ১৫০ মিটারের একটি অংশে সুনির্দিষ্ট গ্রেডের আরসিসি ঢালাই দেওয়ার নিয়ম থাকলেও, বড় মিশ্রণ যন্ত্রের (মিক্সার মেশিন) তোয়াক্কা না করে ছোট হস্তচালিত মিশ্রণ যন্ত্র দিয়ে নামমাত্র ঢালাই দিয়ে কাজ শেষ করা হয়েছে। ফলে সড়কটির স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।স্থায়িত্ব ও মান নিশ্চিতের দাবিতে স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা এই নিম্নমানের কাজের প্রতিবাদ ও জবাবদিহিতা চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাইট ব্যবস্থাপক অত্যন্ত উদাসীন ও দায়সারা আচরণ করেন। তিনি সরাসরি গ্রামবাসীদের ওপর চড়াও হয়ে বলেন, কাজে কোনো সমস্যা থাকলে তারা যেন এলজিইডি অফিসে গিয়ে বা ইঞ্জিনিয়ারের কাছে অভিযোগ করেন। ঠিকাদারের এমন অপেশাদার ও দাম্ভিক বক্তব্যে স্পষ্ট যে, দুর্গম এলাকা হওয়ার সুযোগে এবং প্রশাসনের উর্ধ্বতন মহলের দুর্বল তদারকির সুযোগ নিয়ে তারা এই লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছেন।প্রকৌশলীর রহস্যজনক ভূমিকা:বমু বিলছড়ি ইউনিয়নের সচেতন বাসিন্দারা এই দুর্নীতির বিষয়ে চকরিয়া উপজেলা প্রকৌশলীর (এলজিইডি) সাথে যোগাযোগ করলে তিনি চরম উদাসীনতা প্রদর্শন করেন। শুরুতে তিনি বিষয়টি জানেন না বলে এড়িয়ে যান এবং সবকিছু ঠিকমতো চলছে বলে দাবি করেন। পরবর্তীতে ‘তদন্তে আসবেন’ বলে আশ্বস্ত করলেও আর কোনো খোঁজ নেননি। তদারকি কর্মকর্তার এমন কালক্ষেপণ ঠিকাদারকে নিম্নমানের কাজ তড়িঘড়ি করে কার্পেটিং (পিচ ঢালাই) দিয়ে ঢেকে ফেলার সুযোগ করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
চরম ঝুঁকিতে সরকারি অর্থ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা:কার্পেটিং করার আগেই যেভাবে রাস্তা প্রস্তুত করার কথা, তা না করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বমু বিলছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দারা বলেন, "এই রাস্তাটি আমাদের যোগাযোগের একমাত্র ভরসা। দুর্গম এলাকা হওয়ায় এখানে প্রশাসনের নজরদারি কম। আর এই সুযোগে ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ার মিলে সরকারি টাকার শ্রাদ্ধ করছে। এই রাস্তা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ধসে পড়বে।"দুর্গম বমু বিলছড়ি-ফাঁদুখোলা এলাকার এই পুকুরচুরি বন্ধ করতে এবং দুর্নীতিবাজ ঠিকাদার ও গাফিলতি করা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী, প্রকল্প পরিচালক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।