বিশেষ প্রতিনিধি: ফরিদপুর সদর উপজেলার কানাইপুর ইউনিয়নের মালাঙ্গা এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে বসতবাড়িতে হামলা, মারধর ও টাকা লুটের অভিযোগের ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলা হয়েছে। এক পক্ষের অভিযোগ, হামলায় একই পরিবারের তিনজন আহত হয়েছেন এবং তাদের মধ্যে আল-আমিন নামে এক ব্যক্তি গুরুতর আহত হয়ে ঢাকায় চিকিৎসাধীন। অপরদিকে আসামিপক্ষের দাবি, ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং মামলার তদন্ত নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। ঘটনাটি নিয়ে উভয় পক্ষের বক্তব্য ও মামলার নথি পর্যালোচনায় নিরপেক্ষ ও অধিকতর তদন্তের দাবি উঠেছে। জানা গেছে, মালাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা আলমগীর হোসেন (৬৭) গত ২৫ আগস্ট কোতয়ালী থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি প্রতিবেশী জিয়াউর তালুকদার, লিয়াকত তালুকদার, হাসান বিশ্বাস, আরিফ বিশ্বাস, নাঈম বিশ্বাস, রফিক বিশ্বাস, মাহবুব বিশ্বাস ও লিপি বেগমসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে জমি বিরোধের জেরে তার বাড়িতে প্রবেশ করে হামলার অভিযোগ আনেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার দিন দুপুর ১২টার দিকে অভিযুক্তরা লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আলমগীর হোসেনের বাড়িতে প্রবেশ করেন।
এ সময় তার ছোট ছেলে আল-আমিন (৩২) প্রতিবাদ করতে গেলে তাকে রামদা দিয়ে মাথায় কোপ দেওয়ার পাশাপাশি লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়। বড় ছেলে মোহাম্মাদ আলী (৩৮) ভাইকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে তাকেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ছেলেদের রক্ষা করতে গিয়ে আলমগীর হোসেনও হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া হামলার সময় বসতঘরে থাকা আলমারির ড্রয়ার থেকে গরু কেনার জন্য রাখা ৪ লাখ ৯৫ হাজার টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেছেন আলমগীর হোসেন। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় আহতদের ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। আল-আমিনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় আলমগীর হোসেনের দায়ের করা মামলাটি কোতয়ালী থানার মামলা নং-৬৬, জিআর নং-৬৩৪। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩/৪৪৭/৪৪৮/৩২৩/৩২৫/৩২৬/৩০৭/৩৮০/৫০৬(২)/১১৪ ধারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মামলার আসামিপক্ষ অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলছে, ঘটনার প্রকৃত চিত্র ভিন্ন। আসামিপক্ষের এক কন্যার দাবি, তার বাবা আলমগীর হোসেনের দুই ছেলের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে অবস্থান করছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে ২৬ আগস্ট বিকেল ৩টার দিকে তাকে ফোন করে থানায় ডেকে নেওয়া হয় এবং পরে তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে ২৭ আগস্ট আদালতে পাঠানো হয়েছে। আসামিপক্ষের ওই সদস্যের আরও দাবি, মামলায় তার বাবাকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে কোথা থেকে তাকে আটক করা হয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। একইভাবে জিয়াউর তালুকদারকে গোয়ালচামট পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়টিও তারা প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তাদের দাবি, কোতয়ালী থানার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করলে গ্রেপ্তারের প্রকৃত স্থান ও সময় সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যেতে পারে। এ কারণে তারা ফরিদপুরের পুলিশ সুপারের কাছে সিসিটিভি ফুটেজসহ সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে অধিকতর তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। আসামিপক্ষের আরও অভিযোগ, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. হাসান সিকদারের তদন্তে প্রকৃত ঘটনা যথাযথভাবে উঠে আসেনি।
তাদের দাবি, বাদীপক্ষের কেউ গুরুতর আহত হয়েছেন কি না, হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন কি না এবং কারও হাড় ভাঙার মতো আঘাত রয়েছে কি না—এসব বিষয় চিকিৎসা নথি ও এক্স-রে রিপোর্টের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। আসামিপক্ষের ওই সদস্য বলেন, “আমার দুই ভাইয়ের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে পরিবারটি হিমশিম খাচ্ছে। এ অবস্থায় আমার বাবাকে মামলায় গ্রেপ্তার করায় আমরা আরও বিপদে পড়েছি। আমরা কারও অন্যায়ভাবে সুবিধা চাই না; শুধু প্রকৃত ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। তিনি আরও বলেন, “যদি আমার বাবাকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়ে থাকে, তাহলে থানার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হোক। একইভাবে জিয়াউর তালুকদারকে কোথা থেকে আটক করা হয়েছে, সেটিও সিসিটিভি ও অন্যান্য তথ্যের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব। তদন্তে কোনো ভুল বা অনিয়ম হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানাই। এ বিষয়ে কোতয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ মাহমুদুল হাসান জানান, ঘটনাটি ঘটেছে একটি মারামারির বিষয়ে, সে জন্য দুটি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে।তবে আসামিপক্ষের অভিযোগের বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. হাসান সিকদার গড়িমসি ভাবে কথা বলেছেন যা সন্দেহ ভাজন।
এদিকে, মামলায় বাদীপক্ষের দুই ভাই গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন থাকার দাবি এবং আসামিপক্ষের পক্ষ থেকে তদন্তে অসঙ্গতির অভিযোগ—দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণে চিকিৎসা নথি, এক্স-রে রিপোর্ট, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, মামলার নথি, গ্রেপ্তার সংক্রান্ত রেকর্ড এবং থানার সিসিটিভি ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় ঘটনাটির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং তদন্তে কোনো ধরনের ভুল, অবহেলা বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন আসামিপক্ষের স্বজনরা। একই সঙ্গে আহতদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা। এব্যাপারে আরো জানা গেছে দুই পক্ষের দুই বাদীকে থানায় ডেকে এনে আপস মীমাংসা কথা বলে এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত বাদী মোঃ আলমগীর হোসেন রাজি না হলে দুই পক্ষের দুই বাদীকেই মামলা রুজু করার পূর্বেই থানা হাজতে আটক রাখে এক পর্যায়ে তারা আপস হতে চাই, পরবর্তীতে পুলিশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী দেখতে যান অতঃপর রোগী দেখে এসে আপোষ মীমাংস থেকে বেরিয়ে দুপক্ষের দুটি মামলা নিয়ে তাদেরকে কোর্টে প্রেরণ করেন। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করে চূড়ান্ত সত্য ঘটনা উন্মোচন করার জোর দাবী জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার।