তৌহিদ-উল বারী,বাঁশখালীf (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম। বাংলাদেশের প্রবেশদ্বারও এ চট্টগ্রাম। দেশের জাতীয়, অর্থনৈতিক আর বাণিজ্যিক উন্নয়নে অবদানের দিক থেকে চট্টগ্রামের অবস্থান অন্যান্য বিভাগ থেকেও দারুণ পর্যায়ে। বলতে গেলে প্রায় সবদিকেই চট্টগ্রামের অবদান চোখে পড়ার মতো। দেশের মানুষের কাছে চট্টগ্রামের বেশকিছু দিক থেকে প্রসিদ্ধতার নাম উঠে আসে। তার মধ্যে অন্যতম শুটকির জন্য। চট্টগ্রামের শুটকির কদর যেন দেশ পেরিয়ে বিদেশেও।বিশেষ করে চট্টগ্রামের বাঁশখালী, কক্সবাজার আর সন্দ্বীপ অঞ্চল বাংলাদেশের শুটকির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি হওয়ায় এখানে সহজে নানা ধরনের সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়, আর খোলা রোদ-বাতাসে প্রাকৃতিকভাবে মাছ শুকানোর সুযোগ থাকায় শুটকির মান ও স্বাদ আলাদা হয়ে ওঠে। তবে এসব অবদানের প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে বাঁশখালীর অবস্থানও যেন চোখে পড়ার মতো। মাছের বৈচিত্র্য, প্রথাগত পদ্ধতি আর স্বাদ ও গন্ধের তীব্রতার বিচারে এটির কদর দেশ পেরিয়ে বিদেশেও রয়েছে।
বাঁশখালীর শুটকি পল্লী চট্টগ্রামের শুটকি সংস্কৃতির একেবারে প্রাণকেন্দ্র বলা যায়। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা বাঁশখালীতে বছরের একটা বড় সময় জুড়ে দেখা যায় খোলা আকাশের নিচে সারি সারি বাঁশের মাচা। সেখানে রোদের তাপে আর সমুদ্রের বাতাসে ধীরে ধীরে শুকাতে থাকে লইট্টা, ফাইস্যা, চুরি, রূপচাঁদা, চিংড়িসহ নানা জাতের মাছ। এই প্রাকৃতিক পরিবেশই বাঁশখালীর শুটকিকে দেয় আলাদা স্বাদ আর গুণমান।চট্টগ্রামের বাঁশখালীর প্রাকৃতিক ও বিষমুক্ত শুঁটকি সুস্বাদু হওয়ায় দেশজুড়ে এর ব্যাপক কদর রয়েছে। একটি পরিসংখ্যানের তথ্য মতে, প্রতি মৌসুমে ১৫০-২০০ টন শুঁটকি উৎপাদিত হয়, যার বাজার মূল্য দেড়শ কোটি টাকার বেশি। বঙ্গোপসাগর উপকূলের ছনুয়া, গণ্ডামারা, শেখেরখীল ও বাহারছড়াসহ বিভিন্ন স্থানে লৈট্যা, ছুরি, রূপচাঁদা, ফাইস্যা, মাইট্যা, কোরালসহ প্রায় ২৫ প্রজাতির মাছ থেকে এই শুঁটকি তৈরি হয়।
বাঁশখালীতে উৎপাদিত শুটকি সরাসরি বিদেশে না গেলেও চট্টগ্রাম শহরের বড় বাজার/হোলসেল ও এক্সপোর্ট সিস্টেম দিয়ে এসব শুটকি দেশের বাইরের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো (যেমন সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত) তে এসব শুটকি রপ্তানি করে। পাশাপাশি ইউরোপের কিছু দেশ ওএখানকার অনেক কারো কাছে চাহিদা থাকে মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে।এছাড়াও শুটকি চট্টগ্রামের মানুষের সংগ্রামের কথাও বলে। জেলেদের পরিশ্রম, সমুদ্রের সঙ্গে লড়াই, আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা খাদ্যসংস্কৃতির গল্প জড়িয়ে আছে এতে। তাই শুটকি নিয়ে গর্বও কম নয় এটা চট্টগ্রামের পরিচয়ের একটা বড় অংশ। সম্ভাবনাময়ী দেশের এ শুটকি উৎপাদন আর রপ্তানিতে আরো বৃহৎ পরিসরে অবদান রাখার জন্য বাঁশখালীর শুটকির উৎপাদন বাড়াতে হলে একসাথে প্রযুক্তি, পরিবেশ, অর্থনীতি আর মানুষের দক্ষতার দিকে নজর দিলে দেশের উন্নয়নে এ শুটকি দারুণ প্রভাব রাখবে।
ছনুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা রমিজ মিয়া বলেন, বাঁশখালীর শুটকির আলাদা সুনাম বহু বছরের। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে এসে শুটকি কিনে নিয়ে যান। এখন যদি সরকার আধুনিক প্রযুক্তি, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও বাজারজাতকরণে আরও সহযোগিতা করে, তাহলে এই শুটকি বিদেশের বাজারেও আরও বেশি পরিচিতি পাবে এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বাড়বে।শুটকি ব্যবসায়ী আব্দুল মজুমদার বলেন, আমরা প্রাকৃতিকভাবে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে শুটকি উৎপাদনের চেষ্টা করি। কিন্তু উন্নত শুকানোর ব্যবস্থা, সংরক্ষণাগার ও সহজ রপ্তানি সুবিধার অভাবে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া যায় না। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও ব্র্যান্ডিং নিশ্চিত হলে বাঁশখালীর শুটকি আন্তর্জাতিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।তবে, আধুনিক স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদন পদ্ধতির ক্ষেত্রে বাঁশের মাচার বদলে উন্নত ড্রায়িং র্যাক (উঁচু, জালযুক্ত, ঢাকনাসহ) ব্যবহার, মাছ পরিষ্কার, লবণ দেওয়া ও শুকানোর সময় স্বাস্থ্যবিধি মানা, বৃষ্টি ও আর্দ্রতা থেকে বাঁচাতে সোলার ড্রায়ার চালু করা দরকার। বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, মানসম্মত কাঁচামাল নিশ্চিত করণে জেলেদের জন্য ঠান্ডা সংরক্ষণ (আইস/কোল্ড বক্স) সুবিধা, মাছ ধরার পর দ্রুত প্রক্রিয়াজাতকরণ, নিষিদ্ধ মৌসুমে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা (যাতে চাপ না পড়ে)। উন্নত প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে খোলা শুটকির বদলে ভ্যাকুয়াম প্যাক, লেভেলযুক্ত প্যাকেট ব্যবহার করা যেন সবচেয়ে সুন্দর কৌশল।