মোঃ কাইয়ুম হাসান, স্টাফ রিপোর্টার, ঠাকুরগাঁও
কালের বিবর্তন আর আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামীণ বাংলার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী লোকজ সংস্কৃতি। একসময় বর্ষা এলেই ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের নদী-নালা, খাল-বিলে দেশীয় মাছ শিকারের ধুম পড়ে যেত। পলো, চাঁই, খালই কিংবা ডুলার মতো বাঁশ-বেতের তৈরি নান্দনিক সব ফাঁদ নিয়ে দলবেঁধে মেতে উঠত আবালবৃদ্ধবনিতা। মাছ ধরা কেবল জীবিকা বা খাদ্যসংস্থানের মাধ্যম ছিল না, তা ছিল এক পরম উৎসব ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীক। তবে আধুনিক মাছ ধরার জালের আগ্রাসনে সেই চিরচেনা গ্রামীণ দৃশ্যপট এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। সম্প্রতি বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার কলেজ রোড এলাকায় সাইকেলে করে বাঁশ ও বেতের তৈরি ঐতিহ্যবাহী এসব মাছ ধরার সরঞ্জাম বিক্রি করতে দেখা যায় এক কারিগরকে। তবে একসময়ের তুমুল চাহিদাসম্পন্ন এসব পণ্যের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বেশ নাজুক। ক্রেতা সংকটের কারণে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগরদের জীবন-জীবিকা এখন চরম হুমকির মুখে। স্থানীয় কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অতীতে বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই প্রতিটি ঘরে ঘরে পলো ও চাঁইয়ের সমাদর দেখা যেত। এসব বিক্রি করে কারিগররা বেশ ভালো অঙ্কের অর্থ আয় করতেন। কিন্তু বর্তমানে বাজারে রিং জাল ও কারেন্ট জালের মতো আধুনিক এবং ক্ষতিকর সরঞ্জামের সহজলভ্যতার কারণে দেশীয় লোকজ উপকরণের চাহিদা তলানিতে এসে ঠেকেছে।
ঐতিহ্যবাহী এসব মাছ ধরার ফাঁদ হারিয়ে যাওয়ার পেছনে কেবল আধুনিক প্রযুক্তিই দায়ী নয়, বরং দেশীয় প্রজাতির মাছের তীব্র সংকটকেও অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস ও অবাধে জলাশয় ভরাট। পরিবেশ দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি। ক্ষতিকর কারেন্ট জালের যত্রতত্র ব্যবহার। এসব নানাবিধ কারণে শিং, মাগুর, কৈ, পাবদা, টেংরা ও গজারের মতো সুস্বাদু দেশীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র আজ ধ্বংসের মুখে। মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এসব সনাতন সরঞ্জামের প্রয়োজনীয়তা কমে এসেছে। প্রবীণদের মতে, অতীতে পলো বা চাঁই দিয়ে দলবেঁধে মাছ ধরা এবং পরে তা সমবন্টন করার মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজে যে সম্প্রীতি তৈরি হতো, তা আজ আর দেখা যায় না। লোকজ সংস্কৃতি গবেষক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সরঞ্জামগুলো স্রেফ মাছ ধরার মাধ্যম নয়; এগুলো আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্য, কারুশিল্প ও বংশপরম্পরায় চলে আসা লোকজ জ্ঞানের এক অনন্য নিদর্শন। নতুন প্রজন্ম এই পেশার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় একদিকে যেমন হারিয়ে যাচ্ছে চমৎকার একটি হস্তশিল্প, অন্যদিকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে শত বছরের প্রাচীন জ্ঞান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ বাংলার এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি: দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থলগুলো পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করা। অবৈধ ও ক্ষতিকর কারেন্ট জালের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। এই শিল্পের সাথে জড়িত প্রান্তিক কারিগরদের টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া। সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ না নিলে গ্রামীণ জনপদের শত বছরের এই গৌরবময় কারুশিল্প ও ঐতিহ্য অচিরেই কেবল ইতিহাসের পাতায় বা স্মৃতির পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।