তৌহিদ-উল বারী, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম): পাহাড়ঘেরা সবুজ বন, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, লেকের জলরাশি, পাখির কলকাকলি আর বন্য প্রাণীর বিচরণ- প্রকৃতির এমন অনন্য সমাহার নিয়ে গড়ে উঠেছে চট্টগ্রামের বাঁশখালী ইকোপার্ক। একসময় দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই পার্কে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসতেন বিভিন্ন এলাকার মানুষ। আজ শনিবার (৩১ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায় দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং বিভিন্ন স্থাপনার জরাজীর্ণ দশায় ক্রমেই ম্লান হচ্ছে এর সৌন্দর্য। প্রকৃতির অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ও সংস্কারের অভাবে পর্যটনকেন্দ্রটি হারাচ্ছে তার আগের জৌলুশ।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য
চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৫০-৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে বাঁশখালী উপজেলার শীলকূপ ইউনিয়ন ও জলদী এলাকার বনাঞ্চল ঘিরে অবস্থিত বাঁশখালী ইকোপার্ক। প্রায় এক হাজার হেক্টর এলাকাজুড়ে ২০০৩ সালে পার্কটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাংলাদেশ বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই পার্কের মূল উদ্দেশ্য ছিল বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণ, পরিবেশবিষয়ক শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনের বিকাশ। পার্কটির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বামেরছড়া ও ডানেরছড়া এলাকার পাহাড়ি জলাধার। কৃষিজমিতে সেচের সুবিধা তৈরির উদ্দেশ্যে নেওয়া প্রকল্পের মাধ্যমে এ অঞ্চলে জলাধার গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে পাহাড়, বনাঞ্চল ও জলাধারকে কেন্দ্র করে পর্যটনের সম্ভাবনা তৈরি হয়। বিস্তীর্ণ বনভূমি, উঁচু-নিচু পাহাড়, বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা, পাখি ও বন্য প্রাণীর বিচরণ এই এলাকাকে প্রাকৃতিকভাবে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। পার্কটির অবস্থান চুনতি অভয়ারণ্যের বনাঞ্চলসংলগ্ন হওয়ায় পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব রয়েছে।
একসময় ছিল পর্যটকদের পদচারণায় মুখর
প্রতিষ্ঠার পর বাঁশখালী ইকোপার্ক দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের বিনোদনের অন্যতম গন্তব্যে পরিণত হয়। চট্টগ্রাম শহরসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে পর্যটকেরা এখানে ঘুরতে আসতেন। পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি, লেকের সৌন্দর্য, ঝুলন্ত সেতু এবং নিরিবিলি পরিবেশ ছিল দর্শনার্থীদের প্রধান আকর্ষণ। পর্যটকদের সুবিধার জন্য পার্কে নির্মাণ করা হয় ঝুলন্ত সেতু, পিকনিক স্পট, বসার স্থান, বিশ্রামাগার, পাহাড়ের ওপর কটেজ, পর্যবেক্ষণ টাওয়ারসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এসব অবকাঠামো প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি পরিবার নিয়ে সময় কাটানো ও শিক্ষা সফরের জন্য পার্কটিকে জনপ্রিয় করে তোলে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আকর্ষণ ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম কতটা এগিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনেও পার্কটির অবকাঠামোগত দুরবস্থা ও পর্যটক আকর্ষণ কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে।
২০০৮ সালের পাহাড়ি ঢলে বড় ক্ষতি
বাঁশখালী ইকোপার্কের অবকাঠামোগত সংকটের পেছনে অন্যতম বড় ঘটনা ২০০৮ সালের পাহাড়ি ঢল। ওই সময় পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ছড়ার বাঁধ ভেঙে পার্কের বেশ কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতির মুখে পড়ে। এরপর পার্কটির অবকাঠামো পুনর্গঠন ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয় বলে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো পর্যায়ক্রমে সংস্কার এবং পর্যটকদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে পর্যটনকেন্দ্রটির আকর্ষণ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
জরাজীর্ণ স্থাপনা, ঝুঁকিপূর্ণ ঝুলন্ত সেতু
বর্তমানে বাঁশখালী ইকোপার্কের অন্যতম বড় সংকট এর বিভিন্ন স্থাপনার বেহাল দশা। বিভিন্ন সময়ে সরেজমিন পর্যবেক্ষণভিত্তিক সংবাদ প্রতিবেদনে পার্কের সড়কে গর্ত, আগাছায় ছেয়ে যাওয়া এলাকা, ব্যবহারের অনুপযোগী বিশ্রামাগার এবং নষ্ট হয়ে যাওয়া বিনোদনসামগ্রীর কথা উঠে এসেছে।পার্কের অন্যতম আকর্ষণ ঝুলন্ত সেতুটিও দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকির কারণে আলোচনায় রয়েছে। সেতুর কাঠের পাটাতন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, কিছু অংশ নড়বড়ে হয়ে পড়া এবং কাঠামোর ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের স্থাপনার নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার জরুরি। এ ছাড়া লেকের পানিতে কচুরিপানা জমে থাকা, ব্যবহারের অনুপযোগী নৌকা, পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা কটেজ এবং পর্যটকদের বসার স্থান ও বিশ্রামাগারের দুরবস্থার চিত্রও উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমে। যে স্থাপনাগুলো একসময় পর্যটকদের আকৃষ্ট করত, সেগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না হলে সেগুলোই এখন পর্যটন বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে এসব স্থাপনার বর্তমান অবস্থা নিরূপণে নতুন করে সরেজমিন পরিদর্শন প্রয়োজন।
যোগাযোগব্যবস্থাও পর্যটনের পথে বাধা
পর্যটনকেন্দ্রের সৌন্দর্যের পাশাপাশি সেখানে যাতায়াতের সুবিধা পর্যটক আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাঁশখালী ইকোপার্কে যাতায়াতের সড়ক ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সড়ক সংস্কারের অভাবে পার্কটি পর্যটক হারানোর বিষয়টি উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনেও সড়ক ও সেতুর সমস্যাকে পর্যটকদের ভোগান্তির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে পার্কের ভেতরের সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হলে কিংবা কোনো সেতু নিরাপদে পারাপারের উপযোগী না থাকলে পরিবার, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের নিয়ে ভ্রমণে আসা পর্যটকেরা নিরুৎসাহিত হতে পারেন। অন্যদিকে, সড়ক সংস্কারের কাজ নেওয়া হলেও তার অগ্রগতি, গুণগত মান এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হচ্ছে কি না, সেসব বিষয়েও নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতি যাচাই করে বিস্তারিত তথ্য যুক্ত করা জরুরি।
পর্যটক কমলে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় অর্থনীতি
বাঁশখালী ইকোপার্ক শুধু বিনোদনের স্থান নয়; এটি স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। পর্যটকদের আগমনকে কেন্দ্র করে খাবার, পানীয়, হালকা নাশতা ও অন্যান্য সামগ্রী বিক্রির মাধ্যমে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আয় করার সুযোগ পান। কিন্তু পর্যটকদের আগ্রহ কমে গেলে এসব ক্ষুদ্র ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পার্কের বিভিন্ন স্থাপনা জরাজীর্ণ হয়ে পড়া এবং পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা কমে যাওয়ার বিষয়টি স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এ ছাড়া পর্যটনকেন্দ্রটির উন্নয়ন হলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিবহন খাতের আয় বৃদ্ধি এবং বাঁশখালীর অন্যান্য দর্শনীয় স্থানকে ঘিরে পর্যটন কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
উন্নয়নে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
বাঁশখালী ইকোপার্ককে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বিচ্ছিন্ন সংস্কারকাজের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। প্রথমেই ঝুলন্ত সেতু ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার কারিগরি পরীক্ষা করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ কোনো স্থাপনা পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় মেরামত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পর্যটকদের প্রবেশ সীমিত রাখাও জরুরি। পাশাপাশি পার্কের অভ্যন্তরীণ সড়ক, লেক, নৌকা, বিশ্রামাগার, পিকনিক স্পট, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও বসার স্থান পর্যায়ক্রমে সংস্কার করতে হবে। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত শৌচাগার, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং দিকনির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড স্থাপনও পর্যটকদের জন্য জরুরি। তবে উন্নয়নের নামে বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না। ইকোপার্কের মূল পরিচয় প্রকৃতি ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল। তাই যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশ সংরক্ষণ, বন্য প্রাণীর নিরাপদ বিচরণ এবং বন বিভাগের বিধিবিধানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রটির ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, নিয়মিত তদারকি এবং দর্শনার্থীদের অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় কোন স্থাপনা কখন সংস্কার করা হবে, কত অর্থ প্রয়োজন এবং কাজের অগ্রগতি কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে- তা নির্ধারণ করা হলে উন্নয়ন কার্যক্রম আরও কার্যকর হতে পারে।
সম্ভাবনা আছে, প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ
বাঁশখালী ইকোপার্কের সবচেয়ে বড় সম্পদ এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। পাহাড়, বন, লেক ও জীববৈচিত্র্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই পর্যটনকেন্দ্রকে নতুন করে সাজানোর সুযোগ এখনো রয়েছে। প্রয়োজন পরিকল্পিত উন্নয়ন, নিরাপদ অবকাঠামো, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও সংস্কারসংকটের কারণে পর্যটনকেন্দ্রটির যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণ, পরিবেশকর্মী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রশ্ন হচ্ছে, হাজার হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত এই প্রাকৃতিক সম্পদকে কি যথাযথ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আবারও দক্ষিণ চট্টগ্রামের আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব হবে? নাকি প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সম্ভাবনাময় এই ইকোপার্কের অবকাঠামোগত সংকট আরও দীর্ঘায়িত হবে? বাঁশখালী ইকোপার্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে প্রকৃতি সংরক্ষণ, নিরাপদ পর্যটন এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে কত দ্রুত ও কতটা বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া হয়, তার ওপর।